নেত্রকোনায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০ জন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান পাঁচটির পাসের হার শূন্য শতাংশ। এর মধ্যে চারটি কলেজ এবং একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কলেজ শাখা রয়েছে।
শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাই নয়, জেলার সামগ্রিক ফলাফলও হতাশাজনক। এবার নেত্রকোনার ১০ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ হাজার ৯১১ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৮৭৩ জন। জেলায় পাসের হার ৪৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ আট হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৭০ জন।
গতকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে।
শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে কেন্দুয়া উপজেলার গোপালপুর মডেল কলেজ, কলমাকান্দা উপজেলার কলমাকান্দা মহিলা কলেজ, পূর্বধলা উপজেলার খলিশাপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কলেজ শাখা, এম্বিশন মডেল কলেজ এবং জোবায়দা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজ।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, গোপালপুর মডেল কলেজ থেকে একজন, কলমাকান্দা মহিলা কলেজ থেকে তিনজন, খলিশাপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কলেজ শাখা থেকে চারজন, এম্বিশন মডেল কলেজ থেকে ছয়জন এবং জোবায়দা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজ থেকে ১৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মোট ৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনও পাস করতে পারেননি।
বিশেষ করে ১৬ জন পরীক্ষার্থী নিয়ে জোবায়দা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজের কেউ উত্তীর্ণ না হওয়া এবং বাকি চার প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদেরও শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস না করলে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা কিংবা প্রস্তুতির ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করলেই চলে না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পর্যাপ্ততা, পাঠদানের মান, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার একাডেমিক তদারকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, তা বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ কারণে শূন্য পাসের পেছনে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল কি না, নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, শিক্ষকসংকট ছিল কি না, নাকি পরীক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
নেত্রকোনার সামগ্রিক ফলাফলও নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। ১৩ হাজার ৯১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ হাজার ৮৭৩ জন পাস করায় জেলার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৯১ শতাংশে। ফলে অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৭০ জন। কোন উপজেলায় ফলাফল কেমন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফলাফলের পার্থক্য কতটা এবং কোন বিষয়গুলোতে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের একবার খারাপ ফলাফল করা এবং ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার, ব্যবহারিক ক্লাস, নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল এবং বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার।
এ বিষয়ে জেলার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুনমুন জাহান লিজা বলেন, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিয়ে দ্রুত আলোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীরা কেন অকৃতকার্য হয়েছেন, তা অনুসন্ধান করা হবে। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু শিক্ষক ডেকে বৈঠক কিংবা দায় নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট ও বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
নেত্রকোনায় পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ৩০ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস না করার ঘটনা কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি জেলার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ তৈরি করেছে। কেন একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারলেন না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।









