পীরগঞ্জে আমবাগানে কীটনাশকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, ঝুঁকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় আমবাগানে কীটনাশকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আমের উৎপাদন বাড়ানো ও পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে প্রতিবছর বিভিন্ন পর্যায়ে রাসায়নিক প্রয়োগ করেন বাগানমালিকেরা। তবে এসব রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার মাটি, পানি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ফল ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ব্যয় ও জটিলতার কথা উল্লেখ করে এ পদ্ধতিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেক বাগানমালিক।উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পীরগঞ্জে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এক হেক্টর জমিকে প্রায় পাঁচ বিঘার সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উপজেলায় আমগাছের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ বলে জানা গেছে। এ বছর আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে কোথাও আমের মুকুল ও ফলের পরিমাণ কম, আবার কোথাও তুলনামূলক বেশি। তবে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভালো উৎপাদন ও লাভের আশায় রয়েছেন বাগানমালিকেরা।

আমবাগানে কয়েক দফায় রাসায়নিক প্রয়োগ

আমগাছের পরিচর্যায় বছরের বিভিন্ন সময়ে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বাগানসংশ্লিষ্টদের প্রচলিত চর্চা অনুযায়ী, আশ্বিন-কার্তিক মাসে পাতা ঝরা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এরপর মুকুল আসার আগে গাছের গোড়ায় সারসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ফলের গুটি আসার পর আম সংগ্রহের আগ পর্যন্ত পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, একটি আমবাগানে ফলের গুটি আসা থেকে আম সংগ্রহ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় দফা কীটনাশক প্রয়োগ করা হতে পারে। তবে পুরো উপজেলায় মোট কতবার, কী পরিমাণ এবং কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। এ তথ্য নিশ্চিত করা গেলে কীটনাশক ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সহজ হবে।

মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের আশঙ্কা

কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত বা অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাসায়নিকের ধরন, প্রয়োগমাত্রা ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে মাটির উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে মাটির স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।বৃষ্টির পানির সঙ্গে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাশের পুকুর, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে গিয়ে মিশতে পারে। এতে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে স্প্রে করার সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক কণা আশপাশের মানুষ ও প্রাণীর সংস্পর্শে আসতে পারে। যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া কীটনাশক প্রয়োগ করলে কৃষিশ্রমিক ও বাগানমালিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে।কীটনাশকের প্রভাবে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকাসহ উপকারী কীটপতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু রাসায়নিক পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। খাদ্যশৃঙ্খলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ প্রবেশ করলে তা মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে পীরগঞ্জে এসব ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে পরিবেশগত নমুনা পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বিকল্প হতে পারে ফল ব্যাগিং

আমে কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হলো ফল ব্যাগিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে আমের গুটি উপযুক্ত আকারে পৌঁছানোর পর বিশেষ ধরনের ব্যাগ দিয়ে ফল ঢেকে দেওয়া হয়। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ, ফলের গায়ে দাগ এবং বাহ্যিক ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বাজারজাতকরণের জন্য পরিষ্কার ও আকর্ষণীয় ফল উৎপাদনেও এ পদ্ধতি সহায়ক।আমের পাশাপাশি পেয়ারা, কলাসহ বিভিন্ন ফলেও ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যাগিংয়ের জন্য উপযুক্ত সময়, ব্যাগের ধরন, ফলের অবস্থা ও পরিচর্যার নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। ব্যাগিং সব ধরনের রোগবালাই প্রতিরোধ করতে পারে না; তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা দরকার।বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরোমন ফাঁদ, বাগান পরিচ্ছন্ন রাখা, আক্রান্ত ডাল ও ফল অপসারণ, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ মাত্রায় অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার—এসব ব্যবস্থার সমন্বয় করলে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

ব্যয় বেশি, তাই আগ্রহ কম

পীরগঞ্জের আমবাগানমালিক সাইদুর রহমান বলেন, “ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ব্যয় বেশি হওয়ায় আমরা এ পদ্ধতি ব্যবহার করি না।”উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বলেন, “আমবাগান ব্যবসায়ীরা ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিকে জটিল ও ব্যয়বহুল মনে করেন। এ কারণে হয়তো সহজলভ্য কীটনাশক প্রয়োগের দিকেই ঝুঁকে থাকেন। ইকোসিস্টেমের চেয়ে তাঁরা লাভ-লোকসানের হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দেন।”

প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

আম উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য বাগানমালিক ও কৃষিশ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, কীটনাশকের সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা, ফল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত বিরতিকাল মেনে চলা এবং বাজারে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।একই সঙ্গে ফল ব্যাগিংয়ের উপকরণ সহজলভ্য করা, কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়তে পারে। উৎপাদন ও মুনাফার পাশাপাশি মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া গেলে পীরগঞ্জের আমচাষ আরও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।

Share this news as a Photo Card

সর্বশেষ খবর

পীরগঞ্জে আমবাগানে কীটনাশকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, ঝুঁকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

29 October 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
sftv-bd3
SFtvNewsBD
www.sftvbd.com