অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও নিরলস পরিশ্রম মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রুমানা ইসলাম রুবাইয়া। মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগ দুইটি দোকানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মূলধনে পরিণত হয়েছে। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন থেকে শুরু করে কসমেটিকস ও লেডিস পণ্যের ব্যবসায় সফলতা অর্জন করে তিনি এখন আলমডাঙ্গার অনেক নারীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। প্রায় ১০ বছর আগের কথা। রুমানার স্বামী রায়হান অন্যের একটি কসমেটিকসের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। স্বামীর সঙ্গে দোকানে যাতায়াতের সময় রুমানার মনে স্বপ্ন জাগে, একদিন তাঁদেরও নিজস্ব একটি দোকান হবে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ ছিল কঠিন। তবুও স্বপ্ন দেখা থামাননি তিনি। বরং সীমিত সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজতে থাকেন।
নিজের উদ্যোগের প্রথম ধাপে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন শুরু করেন রুমানা। শুরুতে নানা প্রতিকূলতা ও লোকসানের মুখোমুখি হতে হলেও তিনি দমে যাননি। ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগ থেকে আয় ও সঞ্চয় বাড়তে থাকে। একসময় নিজের সঞ্চয়ের সঙ্গে স্বামীর জমানো টাকা মিলিয়ে তাঁরা আলমডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘রায়হান কসমেটিকস’। এভাবেই বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
ব্যবসার শুরু থেকেই সততা, ক্রেতাদের সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার এবং তাঁদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়াকে প্রাধান্য দেন রুমানা ও তাঁর স্বামী রায়হান। তাঁদের প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। তবে দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম করে পশুপালনের কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন রুমানা। চিকিৎসকের পরামর্শে পশুপালনের কাজ সীমিত করে তিনি মনোযোগ দেন কসমেটিকস ব্যবসায়।
স্বামীর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার নিজের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেন রুমানা। আলমডাঙ্গার জুতাপট্টির জমজম মিয়া সুপার মার্কেটে গড়ে তোলেন ‘রায়হান কসমেটিকস অ্যান্ড রুমানা লেডিস পয়েন্ট’। বর্তমানে এই দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট পাঁচজন কর্মচারী কাজ করছেন। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে তিনজন এবং অন্যটিতে দুজন কর্মরত রয়েছেন। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া উদ্যোগটি আজ তাঁর পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে।
রুমানার এই সাফল্য কেবল আর্থিক অগ্রগতির গল্প নয়; এটি একজন নারীর স্বপ্ন দেখা, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা এবং নিজের যোগ্যতায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনন্য কাহিনি। সীমিত পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি দেখিয়েছেন, সঠিক পরিকল্পনা, সততা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে ধীরে ধীরে সাফল্যের পথ তৈরি করা সম্ভব।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে রুমানার পথচলা হতে পারে অন্যদের জন্য শিক্ষণীয়। বিশেষ করে যেসব নারী আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করতে দ্বিধায় ভোগেন, তাঁদের জন্য তাঁর জীবনসংগ্রাম সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। পরিবারের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখা—সব ক্ষেত্রেই রুমানার এই উদ্যোগের রয়েছে ইতিবাচক তাৎপর্য।
রুমানার গল্প যেন এক বাস্তব শিক্ষা স্বপ্ন পূরণে বড় পুঁজির চেয়েও বড় প্রয়োজন সাহসী উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম এবং হাল না ছাড়ার মানসিকতা। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে আলমডাঙ্গার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রুমানা ইসলাম রুবাইয়া।









