চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাড়াদী গ্রামে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লস্কর আলীর নামে বরাদ্দ করা সরকারি ‘বীর নিবাস’ নির্ধারিত জমিতে নির্মাণ না করে অন্যের জমিতে নির্মাণের সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। তবে ঘরটি বিক্রির অভিযোগের পক্ষে কোনো সরাসরি চুক্তি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
সম্প্রতি ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের পর আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনূর আক্তার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এস. এম. মাহমুদুল হককে প্রধান করে গঠিত কমিটির সদস্য ছিলেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার দে। কমিটি সরেজমিনে বাড়াদী গ্রামে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বীর নিবাসের আবেদনকারী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইসমাঈল হোসেন নির্ধারিত স্থানে ঘরটি নির্মাণ না করে সায়েরা খাতুনের জমিতে সরকারি অর্থে ঘরটি নির্মাণ করেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির কাছে ইসমাঈল হোসেন দাবি করেন, বীর নিবাসের জন্য জমির দলিল জমা দেওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো নকশায় পরিবর্তন আসে। এতে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। নিজের বসতভিটায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি না থাকায় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সায়েরা খাতুনের জমিতে ঘরটি নির্মাণ করা হয় বলে তিনি জানান।
তবে স্থান পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তদন্ত প্রতিবেদনে তার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি অর্থে নির্মিত বীর নিবাসটি ইসমাঈল হোসেন সায়েরা খাতুনের কাছে ৫ লাখ টাকায় বিক্রির মৌখিক চুক্তি করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এর অংশ হিসেবে সায়েরা খাতুন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।
তদন্তের সময় অবশ্য সায়েরা খাতুন বীর নিবাস কেনাবেচার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, ঘর নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমি নিয়ে তিনি ইসমাঈল হোসেনকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইসমাঈল হোসেন ঘর নির্মাণের জন্য মৌখিকভাবে তাকে ১০ শতক আবাদি জমির বিনিময়ে নিজের বসতবাড়ির ২ শতক জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
ইসমাঈল হোসেনও ঘর বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্ত কমিটিকে জানান, বীর নিবাস নির্মাণের সময় তিনি সায়েরা খাতুনের কাছ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। ফলে ঘর বিক্রির অভিযোগের সরাসরি প্রমাণ না মিললেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে তদন্ত কমিটি বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ইসমাঈল হোসেনকে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি অর্থে নির্মিত আবাসন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি তাই নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বীর নিবাস বিক্রি হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি প্রকল্পের অর্থ ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্য, নির্ধারিত স্থানের পরিবর্তে অন্যের জমিতে নির্মাণ, স্থান পরিবর্তনের অনুমোদন এবং সরকারি অর্থে নির্মিত ঘরকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনূর আক্তার বলেন, “তদন্ত কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপরই এখন নির্ভর করছে সরকারি অর্থে নির্মিত এই ‘বীর নিবাস’ নিয়ে ওঠা অভিযোগের পরবর্তী কার্যক্রম।








