নেত্রকোনায় খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক আজকের পত্রিকার নেত্রকোনা প্রতিনিধি সাইফুল আরিফ জুয়েলকে মুঠোফোনে ‘স্টুপিড’সহ অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগ উঠেছে সদ্য বদলি হওয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমানের বিরুদ্ধে। সাংবাদিক সাইফুল আরিফ জুয়েলের দাবি, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ওই কর্মকর্তা তাকে ফোন করে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় তাদের মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথন হয়। ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ডও রয়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনার সূত্রপাত দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি খাদ্য গুদামের (এলএসডি) ধান সংগ্রহ নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন ও ধান সংগ্রহে অনিয়ম এবং একই ব্যক্তির কাছ থেকে একাধিকবার ধান সংগ্রহ করে বিল দেওয়ার অভিযোগে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মেহেদী ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে খাদ্য অধিদপ্তর। গত ৩১ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সংস্থাপন) অনির্বাণ ভদ্র স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর কয়েকদিন পর, গত ৯ সেপ্টেম্বর খাদ্য অধিদপ্তরের উপসচিব মো. মাহাবুর রহমান শেখ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমানকে নেত্রকোনা থেকে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত সহকারী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি করা হয়। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর খাদ্য গুদামের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বদলির বিষয়টি উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। সাংবাদিক জুয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পরদিনই মোয়েতাছেমুর রহমান তাকে ফোন করে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফোনালাপের অডিওতে ওই কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, “আমার নামটা জড়াইয়া নিউজটা করলেন, কী পাইলেন? আমার বদলি নরমাল ওয়েতে হইছে। আমার ছবিটা দিয়া নিউজটা করাতে আপনার কী প্রফিটটা হইছে?”
এ সময় সাংবাদিক সাইফুল আরিফ জুয়েল জানতে চান, প্রকাশিত সংবাদে তার বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা বা আপত্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না। জবাবে ওই কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে মন্দ কিছু লেখা হয়নি বলে জানান। তবে খাদ্য গুদামের অনিয়মের সংবাদের সঙ্গে তার বদলির বিষয়টি প্রকাশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা সাংবাদিককে ‘স্টুপিড’ বলাসহ অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিক জুয়েল। সাইফুল আরিফ জুয়েল বলেন, “আমরা তথ্যবহুল এবং প্রমাণসহ সংবাদ প্রকাশ করেছি। সংবাদের কোনো তথ্য ভুল হলে তিনি পত্রিকা অফিসে প্রতিবাদ দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সাংবাদিককে গালিগালাজ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।” তিনি আরও বলেন, “সংবাদে কোনো তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে আইনি প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ তিনি ফোন করে যে আচরণ করেছেন, তা শিষ্টাচারবহির্ভূত।” এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে মো. মোয়েতাছেমুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফোনালাপে সাংবাদিককে গালিগালাজের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “সাংবাদিক হিসেবে যে নিউজ করেছে—মানে, হয়তো আমি রাগের মাথায় বলছি। আন্দাজে নিউজ করা কি উচিত?”
পরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবাদ কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিককে ‘স্টুপিড’সহ অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে পারেন কি না। এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। খাদ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, বিরিশিরি খাদ্য গুদাম পরিদর্শন ও নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন এবং ধান সংগ্রহে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। একই ব্যক্তির কাছ থেকে একাধিকবার ধান সংগ্রহ ও বিল পরিশোধের বিষয়টিও তদন্তে উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গুদাম কর্মকর্তা মেহেদী ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে নিজের বদলি ওই অনিয়মের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং এটি নিয়মিত প্রশাসনিক বদলি—এমন বক্তব্য এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মোয়েতাছেমুর রহমান। এদিকে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংবাদিককে অশালীন ভাষায় গালিগালাজের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।









