বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত পীরগঞ্জের আসাদুল্লাহর মরদেহ পতাকা বৈঠক শেষে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল রাত ৯টার দিকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত কয়েক বছরে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা অন্যান্য অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব থাকলেও অপরাধের সন্দেহমাত্র কাউকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিভিন্ন নথি ও পর্যবেক্ষণে অতীতে এমন বহু ঘটনার অভিযোগ উঠে এসেছে, যেখানে নিরস্ত্র ব্যক্তি কিংবা পালিয়ে যাওয়ার সময় থাকা ব্যক্তির ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো মানুষের জীবনের অধিকারের সুরক্ষা। জাতিসংঘের Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রথমে অহিংস উপায় ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন জীবন রক্ষার জন্য তা একেবারে অনিবার্য হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলেও তাকে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার করাই স্বাভাবিক ও আইনসম্মত পথ। কোনো অপরাধের অভিযোগই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ শাস্তিতে পরিণত করতে পারে না। কোনো সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বা অবৈধ প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা। তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে তা শুধু মানবাধিকারের প্রশ্নই নয়, বরং আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং জীবনের অধিকারের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তার নামে নির্বিচারে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ তাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এমন প্রাণহানির ঘটনা বন্ধে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, মানবাধিকারসম্মত আচরণবিধির কঠোর অনুসরণ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








