মাদক সেবনের অর্থ জোগাতে নানা অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের দাবি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় মাদকবিরোধী অভিযানে নিশিতা ইয়াসমিন ঐশি (১৯) নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ১৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২৫ গ্রাম গাঁজা, মাদক বিক্রির টাকা হিসেবে দাবি করা নগদ ৬৩ হাজার টাকা এবং চারটি পুরোনো ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে আলমডাঙ্গা পৌরসভার রাধিকাগঞ্জ পৌর পশুরহাট সংলগ্ন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আলমডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নাসির উদ্দিন মোল্লার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল রাধিকাগঞ্জ পৌর পশুরহাট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় মো. রফিকুল ইসলামের বসতবাড়ির সামনে ইটের সলিং রাস্তার ওপর থেকে নিশিতা ইয়াসমিন ঐশিকে আটক করা হয়।
পরে তার কাছ থেকে ১৮ পিস ইয়াবা, ২৫ গ্রাম গাঁজা, নগদ ৬৩ হাজার টাকা ও চারটি পুরোনো ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। জব্দ তালিকার মাধ্যমে এসব আলামত জব্দ করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার নিশিতা ইয়াসমিন ঐশি আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের সরদারপাড়ার মীর সাইদুর ইসলাম খোকনের মেয়ে। বর্তমানে তিনি আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার এরশাদপুর মাগুরাপাড়ায় ওসমান আলীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, ঐশী দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি শুধু মাদক সেবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; মাদক কেনাবেচার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল।
তাদের ভাষ্য, মাদক সেবনের জন্য প্রতিদিন কয়েকটি ইয়াবা ট্যাবলেটের প্রয়োজন হতো তার। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তাকে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করা হতো এবং মাদকের নেশা বজায় রাখতে একটি চক্র তাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত।
স্থানীয়দের দাবি, ইয়াবা সেবনের জন্য প্রতিদিন তার প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা প্রয়োজন হতো। এই টাকা জোগাড় করতে তিনি বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে দ্বিধা করতেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঐশীকে ঘিরে থাকা মাদকচক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, রাধিকাগঞ্জ পশুহাট এলাকা এবং আলমডাঙ্গার বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে মাদক কারবারিদের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ঐশীকে সামনে রেখে বা ‘গুটি’ হিসেবে ব্যবহার করে মাদক কারবার পরিচালনার সুযোগ নিতেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কিছু ব্যক্তি গোপনে ঐশীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন। মাদক সরবরাহের পাশাপাশি তাকে অর্থনৈতিকভাবেও নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলে অভিযোগ তাদের।
তবে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তির নাম পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি কিংবা এ ঘটনায় কাউকে অভিযুক্তও করেনি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো—মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে ঐশী অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ইয়াবা কেনার জন্য টাকা পেলে তিনি বিভিন্ন অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে রাজি হতেন। এমনকি স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি তার এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতেন এবং বিনিময়ে তাকে ইয়াবা বা ইয়াবা কেনার টাকা দিতেন।
তাদের দাবি, কেউ প্রায় ৩৫০ টাকা মূল্যের ইয়াবা কিনে দিলে ঐশীকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হতো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদকের নেশা একজন তরুণীকে কীভাবে ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, ঐশীর ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ। তবে অভিযোগের আড়ালে কোনো সংঘবদ্ধ মাদকচক্র বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ঐশীর ইতোমধ্যে দুইবার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মাদক সেবনের কারণে কোনো সংসারই স্থায়ী হয়নি বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদকের নেশা তার ব্যক্তিগত জীবনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। একপর্যায়ে মাদকের অর্থ জোগাড় করাই তার জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঐশীর কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা থাকলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইতেন না।
তাদের অভিযোগ, মাদকচক্রের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি ঐশীর নেশার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতেন। ফলে ঐশীকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঐশীর কাছ থেকে একসঙ্গে ১৮ পিস ইয়াবা, ২৫ গ্রাম গাঁজা, নগদ ৬৩ হাজার টাকা এবং চারটি পুরোনো মোবাইল ফোন উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন ১৯ বছর বয়সী তরুণীর কাছে এত নগদ টাকা কেন ছিল? এই অর্থের উৎস কী? চারটি মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য রয়েছে? এসব মোবাইল ফোনে মাদক কেনাবেচা, অর্থ লেনদেন কিংবা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া যাবে কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, মোবাইল ফোনগুলোর কললিস্ট, মেসেজ, যোগাযোগের তথ্য এবং মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন যাচাই করা হলে ঐশীর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন এবং মাদক সরবরাহের পেছনে কারা রয়েছেন, তার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, ঐশী যদি সত্যিই মাদকচক্রের একটি অংশ হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে গ্রেপ্তারের মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা, পৃষ্ঠপোষক এবং তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি।
বিশেষ করে স্থানীয়দের অভিযোগে যেসব রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নামের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বানী ইসরাইল বলেন, “গ্রেপ্তার তরুণীর কাছ থেকে ১৮ পিস ইয়াবা, ২৫ গ্রাম গাঁজা, নগদ ৬৩ হাজার টাকা ও চারটি পুরোনো ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
তিনি জানান, উদ্ধার করা মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য আলামত তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থের বিষয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ বলছে, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ঐশী কি শুধুই একজন মাদকসেবী ও খুচরা পর্যায়ের কারবারি, নাকি তার পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো মাদকচক্র? উদ্ধার হওয়া চারটি মোবাইল ফোন, ৬৩ হাজার টাকা এবং তার কথিত যোগাযোগের তথ্যের তদন্তেই এর উত্তর মিলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।








