গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘীর ময়দানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। সমাবেশে তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং জাতিকে অপমান করছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ছয় দফার কোনো একটি দফাও ১১ দলের নিজস্ব দাবি নয়। এগুলো ১৮ কোটি মানুষের দাবি।’ তাঁর দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার পরও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদ জন্ম নেবে না। জুলাই গণহত্যার বিচার আমরা পাব।’ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে, অথচ জনগণকে নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজে হানাহানি, সন্ত্রাস ও চুরির ঘটনা বেড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলে একপর্যায়ে তাদের আওয়ামী লীগের লোকজন হিসেবে দাবি করা হয়; তদন্তে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে পরে তাদের ‘গুপ্ত’ বা অন্য পরিচয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন ঈদের পরের কোনো আন্দোলন নয়। এটি জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন।’ নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায় বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। ‘আমরা বাংলাদেশকে বদলাব, ইনশাআল্লাহ। আমরা আস্থাশীল—জনগণ বিজয়ী হবে। যারা ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত করবে, তারা হেরে যাবে,’ বলেন তিনি।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত না করলে ১১ দল জনগণের সরকার গঠন করে বিচার নিশ্চিত করবে।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, ‘দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এ সরকারের নেই।’ বিরোধী দল সহযোগিতা না করলে সরকার দেশ পরিচালনা করতে পারবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। দেশ এখনো আধিপত্যবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। তবে দুর্নীতি করলে কোনো সহযোগিতা করা হবে না। ‘সংসদ ও রাজপথ আজ একাকার হয়ে গেছে। আপনাদের জবাব দিতে হবে। বিগত স্বৈরাচার ১৬ বছর সময় নিয়েছে, কিন্তু আমরা আর ১৬ বছর অপেক্ষা করব না,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, লংমার্চের উদ্দেশ্য কোনো দল বা ব্যক্তির স্বার্থ হাসিল নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নই তাঁদের আন্দোলনের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হবে—এটাই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘বিএনপি গাদ্দারি করলেও আমরা গাদ্দারি করতে পারব না। এজন্য আজ থেকে আমাদের আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সরকারকে জনগণ ছাড় দেবে না। সরকার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটলে তাদের ফেরাতে চট্টগ্রাম থেকেই আন্দোলন শুরু হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের স্বপ্নের নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে।
সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম জনগণকে নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতে অনেক সরকার এসেছে। কিন্তু কোনো সরকারের আমলে মাত্র ছয় মাসের মাথায় সরকার টিকবে কি না—এমন প্রশ্ন ওঠেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ
এর আগে শনিবার সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ শুরু হয়। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। পরে সকাল সোয়া ৮টার দিকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চের বহর শাপলা চত্বর থেকে রওনা হয়।
লংমার্চের পথে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল এবং চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দানে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের দাবি, নির্ধারিত কর্মসূচির পাশাপাশি পথে আরও কয়েকটি স্থানে মানুষের উপস্থিতির কারণে অনির্ধারিত পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষ লংমার্চের বহরকে অভ্যর্থনা জানায়।
সমাপনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, এলডিপির মহাসচিব অধ্যাপক বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, গুম ফেরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মাদ ফয়সাল এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
সমাবেশে বক্তারা তাঁদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।








