রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল গাছ। প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারীদের ছায়া দেয় গাছটি। অথচ সেই গাছের গুঁড়ি এখন যেন বিজ্ঞাপনের বোর্ডে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রচার, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, কোচিং সেন্টারের প্রচারপত্র, চিকিৎসাসেবার বিজ্ঞাপন ও নানা অনুষ্ঠানের পোস্টারে ঢেকে গেছে গাছটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য। গাছে পেরেক ঠুকে, তার বেঁধে ও দড়ি ব্যবহার করে লাগানো হয়েছে অসংখ্য পোস্টার ও ব্যানার। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু একটি গাছ নয় পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে থাকা বহু গাছকে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের সৌন্দর্য। সম্প্রতি উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দেখা যায়, বড় একটি গাছের গুঁড়ি ও ডালজুড়ে ঝুলছে নানা ধরনের পোস্টার ও ব্যানার। কোনোটি পেরেক দিয়ে আটকানো, কোনোটি তার দিয়ে বাঁধা। আবার পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার লাগানো হয়েছে। ফলে গাছটির স্বাভাবিক অবয়ব অনেকটাই আড়াল হয়ে গেছে।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয় এবং পরিবেশ রক্ষা করে। অথচ আমরা নিজেরাই গাছকে বিজ্ঞাপনের খুঁটি বানিয়ে ফেলেছি। পোস্টার লাগানোর জন্য গাছে পেরেক মারা মোটেও উচিত নয়।”
আরেক সচেতন নাগরিকের ভাষ্য, শহর ও গ্রামে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যেখানে-সেখানে গাছে পোস্টার লাগানোর কারণে পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, “আজ একটি পোস্টার লাগানো হচ্ছে, কাল আরেকটি। একসময় পুরো গাছটাই বিজ্ঞাপনের বোর্ডে পরিণত হয়।”
পরিবেশসচেতনদের মতে, গাছের গায়ে পেরেক ঠোকা বা তার শক্তভাবে বাঁধার কারণে গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষতস্থানে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক ও রোগজীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হয়। বিশেষ করে একই গাছে বারবার পেরেক লাগানো হলে দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষার কথা শেখাই। কিন্তু বাস্তবে যদি রাস্তার পাশের গাছগুলোকে এভাবে নষ্ট হতে দেখি, তাহলে আমাদের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার মিল কোথায়? গাছকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার।”
এক ব্যবসায়ী জানান, বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে তার জন্য পরিবেশ ধ্বংস করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, “পৌরসভা বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে পোস্টার ও ব্যানার লাগালে গাছও রক্ষা পাবে, আবার প্রচারকারীরাও সুবিধা পাবেন।”
স্থানীয় তরুণদেরও এ বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রচারের জন্য গাছ ব্যবহার করছে। অথচ সচেতনতার অভাবে এটি একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে।
এক কলেজশিক্ষার্থী বলেন, “পরিবেশ রক্ষার কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু ছোট ছোট অসচেতন কাজের মাধ্যমেই পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছে পোস্টার লাগানো বন্ধ করতে হলে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।”
পরিবেশবিদদের মতে, সবুজ পরিবেশ রক্ষায় শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যে গাছগুলো ইতোমধ্যে বড় হয়েছে, সেগুলোকে সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গাছের গায়ে পেরেক মারা, বিজ্ঞাপন ঝোলানো কিংবা ক্ষতিকর বস্তু বাঁধার মতো কাজ থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, গাছকে বিলবোর্ডে পরিণত করার এই প্রবণতা বন্ধে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। নির্দিষ্ট স্থানে বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপন এবং গাছে পোস্টার লাগানোর বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
প্রকৃতির নীরব এই প্রহরীরা কথা বলতে পারে না। তাই তাদের রক্ষার দায়িত্ব মানুষেরই। গাছ যেন আর বিজ্ঞাপনের বোর্ড না হয় সবুজকে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যেই বাঁচতে দেওয়া হোক।









