দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবা। অন্ধকার একটি ঘরে বই দিয়ে সাজানো ছোট্ট কক্ষে কাঠের ডেস্কে বসে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনো। বাইরে থেকে দেখলে তাঁকে আর দশজন শিক্ষকের মতোই মনে হবে। শিক্ষার্থীরা তাঁর কক্ষে ঢোকার আগে দরজায় কড়া নাড়ে, তিনি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করেন, স্কুলমাঠের কাজকর্ম তদারক করেন এবং শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ে নির্দেশনা দেন।
তবে তাঁর জীবনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বেতন পাননি ৬৭ বছর বয়সী এই শিক্ষক। শুধু সান্তিনো নন, রাজধানী জুবার গুম্বো বেসিক স্কুলের কোনো শিক্ষক-কর্মচারীই দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না। একই পরিস্থিতি দক্ষিণ সুদানের সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষকদেরও।
স্বাধীনতার এক দশকের বেশি সময় পরও দক্ষিণ সুদানের শিক্ষা খাত এখন গভীর সংকটে। দীর্ঘ স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ২০১১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা দক্ষিণ সুদানকে আফ্রিকার অন্যতম ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি তহবিলের সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলায় দেশটির স্কুলগুলো এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।
দেশটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ বছর বা তার নিচে। অথচ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী শিশুদের মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদেরও একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় পড়া, লেখা ও মৌলিক গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। অর্থের অভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণসহ মৌলিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই সংকটের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনো। কেন বেতন না পেয়েও প্রতিদিন স্কুলে আসেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি তাঁর চাকরিকে খুব ভালোবাসেন।
সরকারি বেতন না থাকায় স্ত্রী ও ছয় সন্তানের সংসার চালাতে নিজের দৈনন্দিন খরচ কমিয়ে দিয়েছেন সান্তিনো। শিক্ষার্থীদের পরিবারও সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যালয় পরিচালনায় সামান্য আর্থিক সহায়তা দেয়। প্রতিদিন ভোরে প্রায় চার মাইল হেঁটে স্কুলে আসেন তিনি। দিন শেষে স্কুলের দরজায় তালা লাগিয়ে আবার চার মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরেন।
গুম্বো বেসিক স্কুলের পরিস্থিতি অন্যান্য অনেক স্কুলের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও সংকটের শেষ নেই। স্কুলেই শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের গরম খাবার রান্না করা হয়। অভিভাবকদের দেওয়া সামান্য অনুদান এবং সীমিত সহায়তার ওপর নির্ভর করেই চলছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিটি শ্রেণিতে গড়ে প্রায় ৮৭ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।
বিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্কুলমাঠের নলকূপ। নলকূপটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এটি মেরামতের মতো অর্থও বিদ্যালয়ের হাতে নেই।

এদিকে দক্ষিণ সুদানের শিক্ষা খাতে বিদেশি সহায়তার ভূমিকা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিদেশি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দক্ষিণ সুদান সরকার নিজস্ব অর্থে মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার দায় থেকে সরে যাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে দক্ষিণ সুদানের শিক্ষা খাতের দুরবস্থার জন্য শুধু বিদেশি তহবিলের ঘাটতিকে দায়ী না করে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, দেশটির তেল বিক্রির বিপুল রাজস্বের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি; অথচ ওই অর্থ শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় ব্যয় করা সম্ভব ছিল।
তবে দক্ষিণ সুদানের তথ্যমন্ত্রী আতেনি ওয়েক আতেনি বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বেতন না পেয়েও কাজ চালিয়ে যাওয়ায় দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, টিকে থাকতে হলে দক্ষিণ সুদানকে এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি অর্থের ঘাটতি ও বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার টানাপোড়েনের মধ্যেও দক্ষিণ সুদানের কিছু স্কুল টিকে আছে মূলত শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আর পল সান্তিনোর মতো শিক্ষকরা বেতন ছাড়াই প্রতিদিন স্কুলে এসে প্রমাণ করছেন—শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা কখনো কখনো অর্থের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এভাবে আর কতদিন? একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে, তখন স্কুল ও শিক্ষকদের টিকিয়ে রাখতে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।









