রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনার কেন্দ্রে মির্জা ফখরুল, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনার কেন্দ্রে মির্জা ফখরুল, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিককে ঘিরে এবার আলোচনা শুরু হয়েছে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করেনি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) তাকে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। পারিবারিকভাবেই রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হলেও ছাত্রজীবনেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারি জীবনীতে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের এসব তথ্য উল্লেখ রয়েছে। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে না গিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।

১৯৭৯ সালের দিকে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে এরশাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন।

জাতীয় সংসদে তার প্রথম জয় আসে ২০০১ সালের নির্বাচনে। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন তিনি। ২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি জীবনীতে তার জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশিত রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে কেন আলোচনা?

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে।

এমনকি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

তবে মির্জা ফখরুল নিজে ২৭ জুলাই সাংবাদিকদের বলেছেন, যথাসময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। অর্থাৎ, তার বক্তব্যেও দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হতে হলে প্রথমে দলীয় মনোনয়ন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় ভোটের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় এগিয়ে রাখছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

তবে রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।

ধর্মীয় পরিচয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন—বাসসের জীবনীভিত্তিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তবে তার ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত বা অনুমাননির্ভর বক্তব্য না দেওয়াই সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যুক্তিযুক্ত।

সামনে কী? রাষ্ট্রপতি পদে কে প্রার্থী হবেন—এ নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে এসেছে।

ফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের সামনে এখন নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে—তিনি কি বিএনপির মহাসচিব ও মন্ত্রী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন, নাকি দেশের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্বে যাবেন?

এর উত্তর মিলবে বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

তবে আপাতত নিশ্চিত তথ্য হলো—রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে; তাকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।

Share this news as a Photo Card

সর্বশেষ খবর

রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনার কেন্দ্রে মির্জা ফখরুল, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়

10 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
sftv-bd3
SFtvNewsBD
www.sftvbd.com