মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান ও কৃষিজমিতে যেতে কাদা-ধুলোই ভরসা; দুই হাজারের বেশি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পাকা সড়ক নির্মাণ চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পারকুলা গ্রামের মন্ডলপাড়ায় মাত্র এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা যেন হাজারো মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত রাস্তার স্থায়ী উন্নয়ন না হওয়ায় এলাকাবাসী বছরের পর বছর কাদা, পানি ও ধুলোর সঙ্গে লড়াই করে চলাচল করছেন। এই রাস্তাটি শুধু একটি গ্রামের যোগাযোগের পথ নয়; এটি পারকুলা মন্ডলপাড়া জামে মসজিদ, ঈদগাহ ময়দান, দুই সমাজের যৌথ কবরস্থান এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে যাওয়ার একমাত্র সংযোগ সড়ক। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ এই রাস্তা ব্যবহার করেন। এছাড়া মন্ডলপাড়া, তাঁতিপাড়া (মোল্লাপাড়া)সহ আশপাশের কয়েকটি মহল্লার মানুষের একমাত্র যাতায়াতের পথও এটি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুকনো মৌসুমে রাস্তা ধুলায় ঢেকে যায়। সামান্য বাতাসেই ধুলো উড়ে বাড়িঘর, দোকানপাট ও পরিবেশ দূষিত করে। আর বর্ষা এলেই পুরো রাস্তা হাঁটুসমান কাদা ও পানিতে তলিয়ে যায়। তখন মোটরসাইকেল, ভ্যান, এমনকি হেঁটেও চলাচল করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাজিদুর রহমান চাঁদ বলেন, তাঁর জন্মের পর থেকে এই রাস্তার কোনো স্থায়ী সংস্কার দেখেননি। ২০১৮ ও ২০২২ সালে একাধিকবার রাস্তার মাপজোক হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কাজ শুরু হয়নি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা রাস্তা নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এই রাস্তার পাশে রয়েছে মসজিদ, ঈদগাহ ও দুই সমাজের যৌথ কবরস্থান। বর্ষার সময় কোনো ব্যক্তি মারা গেলে মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। কখনও কখনও কাদার কারণে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, পারকুলা গ্রামে প্রায় ৩ হাজার ২০০ ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে মন্ডলপাড়াতেই দুই হাজারের বেশি ভোটার বসবাস করেন। এত বড় জনবসতি থাকা সত্ত্বেও আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পাকা না হওয়ায় এলাকাবাসী নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, বহু জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা রাস্তা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব উন্নয়নই দেখতে চান। একাধিক মুসল্লি জানান, বর্ষাকালে মসজিদে নামাজ আদায় করতে গিয়ে কাপড় কাদায় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় হাঁটুসমান কাদা পেরিয়ে ওজু ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির দিনে অনেকেই তাই মসজিদে যেতে পারেন না। ঈদগাহ কমিটির সদস্যরা জানান, পারকুলা মন্ডলপাড়া ঈদগাহ ও কবরস্থান ১৯৮৭ সালের ৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঈদগাহর গেট নির্মাণ হলেও সেখানে যাওয়ার মূল রাস্তা এখনও কাঁচা। কাদার কারণে একাধিকবার ঈদের জামাতে মুসল্লিদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো বছর ঈদগাহে নামাজ আদায় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, এই রাস্তা দিয়েই মাঠে যেতে হয়। ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ঘরে তুলতে গিয়ে অতিরিক্ত শ্রম ও ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। কাদা থাকলে যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না, আবার শুকনো মৌসুমে ধুলার কারণে চলাচলও কষ্টকর হয়ে ওঠে। গরু-ছাগল মাঠে নেওয়া কিংবা কৃষিযন্ত্র পরিবহনেও একই সমস্যা দেখা দেয়। স্থানীয় তরুণদের ভাষ্য, রাতের বেলায় কোনো গর্ভবতী নারী বা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে বিপাকে পড়তে হয়। কাঁচা রাস্তার কারণে অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে প্রবেশ করতে পারে না। রোগীকে কয়েক কিলোমিটার দূরের পাকা সড়ক পর্যন্ত ভ্যান বা অন্য উপায়ে নিয়ে যেতে হয়, যা অনেক সময় জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরেক বাসিন্দা বলেন, গ্রামের রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার কারণে অনেক সময় বিয়ের সম্বন্ধও ভেঙে যায়। পাত্রপক্ষ এসে রাস্তার অবস্থা দেখে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে ফিরে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদের আগে নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে কয়েকজন মিলে কিছু মাটি ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বর্ষার বৃষ্টিতে সেই মাটিও ধুয়ে গেছে। ফলে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে রাস্তা। এলাকাবাসীর মতে, এই সড়কটি পাকা হলে শুধু কয়েকশ পরিবার নয়, আশপাশের কয়েকটি মহল্লার হাজারো মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত নিশ্চিত হবে, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়াও অনেক সহজ হবে। তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি এবং জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত সরেজমিনে এসে বাস্তব অবস্থা পরিদর্শন করে দীর্ঘদিনের এই জনদুর্ভোগ নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে এক কিলোমিটার রাস্তা পাকা নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন। স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা—প্রতিশ্রুতি নয়, এবার যেন বাস্তবেই শুরু হয় পারকুলা মন্ডলপাড়ার বহু প্রতীক্ষিত সড়ক নির্মাণ।








