প্রতিদিন ভোরে একজন শিক্ষক ঘর থেকে বের হন একটি স্বপ্ন বুকে নিয়ে—দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন। কিন্তু সেই শিক্ষকই যখন মাসের পর মাস নিজের প্রাপ্য বেতন থেকে বঞ্চিত হন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত কষ্ট আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না; তা একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব সংকটে রূপ নেয়। এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, গত মে মাসের বেতন এখনও পরিশোধ না হওয়ায় তারা চরম আর্থিক দুর্ভোগে পড়েছেন। সংসারের প্রতিটি দিন যেন এখন হিসাব-নিকাশের কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কারও ঘরে চাল শেষ, কারও সন্তানের স্কুলের খরচ বাকি, আবার কেউ অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমের মৌসুমে বাজার ভরে উঠেছে নানা জাতের আমে। কিন্তু একজন শিক্ষক যখন সন্তানের ছোট্ট অনুরোধ—”বাবা, একটা আম কিনে দেবে?”—পূরণ করতে পারেন না, তখন সেই নীরব কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে না পারার বেদনা একজন বাবার হৃদয়কে প্রতিনিয়ত বিদীর্ণ করে। শুধু সন্তান নয়, অনেক শিক্ষক বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে দিতে পারছেন না। ভাঙা চশমা বদলানো, মাসের বাজার করা কিংবা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ভাড়াও অনেকের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও তারা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সততা, নৈতিকতা ও মানবিকতার পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষকদের দাবি, তারা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ চান না। তারা চান তাঁদের ন্যায্য অধিকার—সময়মতো প্রাপ্য বেতন। কারণ একজন শিক্ষক আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকলে তার প্রভাব শুধু তাঁর পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রতিফলন পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও।সচেতন মহলের মতে, যে রাষ্ট্র শিক্ষকদের সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সেই রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যায়। আর শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠন কখনোই সম্ভব নয়। এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত বেতন পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতি গড়ার কারিগরের ঘরে যদি অভাবের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, তবে সেই দীর্ঘশ্বাস একদিন পুরো জাতির ভবিষ্যতের ওপরই ছায়া ফেলতে পারে। তাই শিক্ষকের সম্মান রক্ষা ও সময়মতো প্রাপ্য বেতন নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে মানবিক দাবি।








