ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ উঠেছে চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে। এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের মারধর ও ধাক্কাধাক্কিতে সাংবাদিক ও এক বিচারপ্রার্থীসহ অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। আদালতে প্রবেশের সময় এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন—জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল কাউছার, আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন এবং বিচারপ্রার্থী সুজন চন্দ্র। আহতদের মধ্যে আশিকুজ্জামানের পিঠে এবং আব্দুল্লাহ আল কাউছারের কাঁধ ও হাতে আঘাত লাগে। পরে তাঁরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেওয়ার পর বের হওয়ার সময় পরীমণি সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে যান এবং অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ সময় আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেনের হাতে খামচি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর আগে সকাল সোয়া ১১টার দিকে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান পরীমণি। আদালতের কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তিনি গাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ঘিরে রাখেন। পরে আদালত কক্ষে প্রবেশের সময় সাংবাদিক ও উৎসুক মানুষের ভিড় তৈরি হয়। লিফটে ওঠার সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাঁদের ধাক্কাধাক্কি হয়। এ সময় সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজুর হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন পরীমণি বলে অভিযোগ করা হয়। পরে তাঁর হাত থেকে ফোনটি ফিরিয়ে নেন ওই সাংবাদিক। রবিউল হোসাইন রাজু বলেন, পরীমণি আদালতে পৌঁছালে তাঁরা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। লিফটে ওঠার সময় উত্তেজিত হয়ে পরীমণি তাঁর ফোন কেড়ে নেন। এ সময় পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁর ট্রাইপডও ভেঙে ফেলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মাহফুজুর রহমানের আদালতে হাজির হন পরীমণি। তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ালে তাঁর আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন নিয়ে আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও পরীমণিকে ঘিরে রাখেন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা। সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে আবারও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বিচারপ্রার্থী সুজন চন্দ্রের মাথা ফেটে যায় এবং রক্তক্ষরণ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালত ভবনের নিচে গাড়িতে ওঠার আগে পরীমণি আবারও সমকালের সাংবাদিক রবিউল হোসাইন রাজুর দিকে তেড়ে গিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিকরা। জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান জানান, পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁর মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল কাউছার বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি নিজেসহ একাধিক গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়েছেন। একজন বিচারপ্রার্থীর মাথাও ফেটেছে। অথচ পুরো ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা কোর্ট পুলিশের সদস্যদের দৃশ্যমান ভূমিকা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, একজন আসামি প্রায় ১০ জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে আদালতে এসে সাংবাদিক ও বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে যেভাবে ধাক্কাধাক্কি ও মারধরের ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের এমন দাপট দেখানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। ঘটনার পর দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন পরীমণি। তাঁর দাবি, ভিড়ের মধ্যে সাংবাদিকরা তাঁর গায়ে পড়ার চেষ্টা করেন এবং আদালত থেকে বের হওয়ার সময় তাঁদের দেখতে পান। তবে সাংবাদিক রবিউল হোসাইন রাজু এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পরীমণির সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট দূরত্ব ছিল। ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখলেই প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হবে। তাঁর কেড়ে নেওয়া ফোনটি তিনি পরীমণির হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও জানান। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় এদিন আদালতে হাজির হন পরীমণি। ২০২২ সালের ৬ জুলাই তিনি আদালতে মামলাটি করেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন আদালত। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পরিদর্শক মনির হোসেন পরীমণি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল আদালত দুই আসামিকে ২৫ জুন হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন। নির্ধারিত দিনে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তাঁরা। পরবর্তী সময়ে মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে ২৭ মার্চ রিভিশন আবেদন করেন পরীমণি। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাজ্জাদুর রহমান খান তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলতে বাধা নেই বলে আদেশ দেন আদালত।









