চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র মীর মহিউদ্দিনের নাম স্থানীয় রাজনীতি ও জনসেবার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে। দুই মেয়াদে আলমডাঙ্গা পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করা মীর মহিউদ্দিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা এখনও স্মরণ করেন স্থানীয়দের অনেকে।
মীর মহিউদ্দিনের দুই মেয়ের মধ্যে বড় ডা. আদনীন নাহার মৌনালী। বাবার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড খুব কাছ থেকে দেখেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। তবে বাবার রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে না রেখে চিকিৎসা পেশার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বর্তমানে তাঁর প্রধান লক্ষ্য। দেশে ও বিদেশে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকার পাশাপাশি অসহায় মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা, দুর্গত এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প এবং অনলাইনে রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে আসছেন তিনি।
ভবিষ্যতে বাবার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও জনসেবার ঐতিহ্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ডা. মৌনালী। পাশাপাশি নিজ এলাকা আলমডাঙ্গায় স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর।
আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার আলিফ উদ্দিন রোডের বাসিন্দা মীর মহিউদ্দিন পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৪ সালে প্রথমবার এবং ২০১০ সালে দ্বিতীয়বার আলমডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে জানান তাঁর মেয়ে ডা. মৌনালী।

পরিবারের দাবি, মেয়র থাকাকালে আলমডাঙ্গা শহরের বাস টার্মিনাল, শহীদ মিনার, স্বাধীনতা স্তম্ভ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শহরের আলোকায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে মীর মহিউদ্দিনের ভূমিকা ছিল। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণেও তিনি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন বলে দাবি পরিবারের।
বাবার সেই জনসম্পৃক্ততা ও মানবিক আচরণ ডা. মৌনালীর জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর ভাষ্য, বাবা কখনো মানুষকে দল বা পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখতেন না; মানুষকে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করতেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবিকতার শিক্ষা তিনি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন।
মীর মহিউদ্দিনের দুই মেয়ের মধ্যে বড় ডা. আদনীন নাহার মৌনালী। বাবার আদরের দুই মেয়ের মধ্যে বড় হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
১৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই চিকিৎসকের বয়স ৩২ বছর। তাঁর বিয়ে রাজবাড়ীতে। স্বামী মো. মেহেদি হাসান একজন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের পাবলিক সেক্টরে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের মেডিকেল অ্যান্ড এডুকেশন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ডা. মৌনালী ও মেহেদি হাসানের সংসারে রয়েছে এক সন্তান। শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন ডা. মৌনালী। আলমডাঙ্গার শিশুকুঞ্জ প্রিপারেটরি স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন।

এরপর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকার শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এমবিবিএস পড়াশোনা করেন। ২০১৬ সালে ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর চিকিৎসা পেশায় নিয়মিতভাবে যুক্ত হন ডা. মৌনালী। কর্মজীবনের শুরুতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশ এভারকেয়ার হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করেন। শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিকিৎসা পেশায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ নিউরোসার্জারি নিয়ে। এ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য ২০১৭ সালে বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কলারশিপের মাধ্যমে চায়না স্কলারশিপ কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি নিয়ে চীনে যান তিনি।
চীনের তিয়ানজিন মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে নিউরোসার্জারি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে-বিদেশে চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের ব্লু বেল মেডিকেল সেন্টারে মেডিকেল ডাইরেক্টর, জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও নিউরোসার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. মৌনালী।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও চিকিৎসাসেবায় সক্রিয় ছিলেন ডা. মৌনালী। ট্রিপল থ্রি হেল্পলাইনে বিশেষ চিকিৎসক হিসেবে কোভিড আক্রান্ত রোগীদের টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ দেন তিনি।
এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে টেলিমেডিসিনে দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে পুরস্কার পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
করোনাকালীন সময়ের একটি ঘটনা তাঁর চিকিৎসকজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে চীন থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানে এক যাত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর শ্বাসকষ্টের উপসর্গ দেখা দিলে বিমানে চিকিৎসকের খোঁজ করা হয়। তখন ডা. মৌনালী এগিয়ে গিয়ে ওই যাত্রীকে চিকিৎসাসেবা দেন।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে রোগীকে হস্তান্তর করে তিনি বাড়ি ফেরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার পর চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তাঁকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ইউরোপ সফরের সময় এক স্প্যানিশ নাগরিক বিমানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকেও চিকিৎসাসেবা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেন ডা. মৌনালী।
মানুষের সেবাকে শুধু চিকিৎসা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না ডা. মৌনালী। স্কুলজীবনে গার্লস গাইডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক ও ত্রাণমূলক সংগঠনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পড়ার সময় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) মহিলা প্লাটুনে যুক্ত হন। সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে অংশ নেন।
দেশে থাকার সময় বিভিন্ন দুর্গত ও বন্যাকবলিত এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য আয়োজিত মেডিকেল ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন। গত বছর ডায়াবেটিক সমিতির সঙ্গে আয়োজিত একটি বিনামূল্যের মেডিকেল ক্যাম্পেও চিকিৎসাসেবা দেন তিনি।
পাশাপাশি অনলাইনে দেশ-বিদেশের রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অসচ্ছল রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিনামূল্যেও চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি।
নিজ এলাকা আলমডাঙ্গার মানুষের জন্য স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে চান ডা. মৌনালী। তাঁর স্বপ্ন, আলমডাঙ্গায় এমন একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন।
পরিকল্পিত হাসপাতালটিতে আইসিইউ, এইচডিইউ ও পিআইসিইউসহ জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
ডা. মৌনালীর মতে, এলাকার কোনো মানুষ হঠাৎ বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো জরুরি সমস্যায় আক্রান্ত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য যেন দূরের শহরে ছুটতে না হয়। দ্রুত চিকিৎসা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে একটি মানবিক ও সেবামূলক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলতে চান তিনি।
বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ডা. মৌনালীর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তবে নিজের অবস্থান সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বর্তমানে তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত নন।
তবে ছোটবেলা থেকেই পরিবারের রাজনৈতিক পরিবেশ দেখেছেন তিনি। বাবার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলেছে। বাবার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও জনসম্পৃক্ততার আদর্শ নিজের জীবনে ধরে রাখতে চান।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ও সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে তাঁর প্রধান মনোযোগ চিকিৎসা ও সামাজিক সেবায় বলে জানান তিনি।
মেয়র পদে নির্বাচন করার বিষয়ে ডা. মৌনালী বলেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে এ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেই। তাঁর কাছে জনপ্রতিনিধির পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. আদনীন নাহার মৌনালীর কাছে বাবার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো রাজনৈতিক পদ নয়; মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা।
তিনি চান, মানুষ তাঁকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, একজন চিকিৎসক ও মানবিক মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। বাবার যে জনসম্পৃক্ততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার পরিচয় ছিল, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই ঐতিহ্য ধরে রাখাই তাঁর লক্ষ্য।
তাঁর ভাষ্য, বাবার মতো মানুষের জন্য যতটা করা সম্ভব হয়নি, অন্তত তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে যেতে চান তিনি।
চিকিৎসা পেশায় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও নিজের শিকড় আলমডাঙ্গায়। চিকিৎসার পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের জন্য একটি আধুনিক ও স্বল্প ব্যয়ের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় এবং বাবার জনসেবার ঐতিহ্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা—এই তিনটি বিষয়ই ডা. আদনীন নাহার মৌনালীর ভবিষ্যৎ পথচলার মূল ভাবনা হয়ে উঠেছে।








