কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় দুধকুমার নদীর তীব্র ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছপালা ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে অন্তত অর্ধশত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও শত শত পরিবার। নদীর ভাঙনে গোবিন্দপুর ও আজিজপাড়া এলাকার বহু পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি জামে মসজিদ, কবরস্থান ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে পাঁচগাছি ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুধকুমারের তীব্র স্রোতে নদীর তীর ভেঙে পড়ছে। ভাঙন আতঙ্কে অনেক পরিবার বসতঘর, গাছপালা ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে বসতভিটা ও স্থাপনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত সাত দিনের ভাঙনে অর্ধশতাধিক পরিবারের বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছপালা ও কবরস্থান নদীগর্ভে চলে গেছে। এর মধ্যে শওকত, জয়নাল, জামাদার ও অহেদুল ইসলামসহ কয়েকজন গত এক সপ্তাহে তাঁদের পুরোনো বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন।
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, নদীর স্রোত বাড়লেই তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার রাতে ঘুমাতে পারছে না। কখন কার বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যায়—এই আশঙ্কায় কেউ কেউ রাত জেগে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে পঞ্চাশোর্ধ্ব জামাদার বলেন, ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নতুন করে বসতবাড়ি নির্মাণের মতো জায়গাও অনেকের নেই। তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পাঁচগাছি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দুধকুমারের ভাঙনে দুই শতাধিক পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। একই সময়ে অন্তত ১০০ একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইউনুস আলী বলেন, “গত ছয় মাসে দুধকুমারের ভাঙনে অন্তত দুই শত পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। বর্তমানে নদীর ভাঙনের যে পরিস্থিতি, তাতে স্থানীয়রা দিশেহারা। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই মৌজাটি ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “গোবিন্দপুর এলাকায় যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, দ্রুত প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নিলে কয়েক দিনের মধ্যে গ্রামের অবশিষ্ট অংশও বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দেড় মাস আগে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ভাঙন প্রতিরোধে গোবিন্দপুর এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। কিন্তু নদীর তীব্র স্রোতে সেগুলোর অধিকাংশই নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে ভাঙন প্রতিরোধে ওই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি বলে দাবি তাঁদের। ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর ভাঙনকবলিত এলাকায় মানববন্ধনও করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। এ বিষয়ে শনিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ওই এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে। এখনো বরাদ্দের বিষয়ে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। উত্তর পাওয়া গেলে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুধকুমার নদীর অব্যাহত ভাঙনে একদিকে যেমন মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছে, অন্যদিকে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি ও স্থানীয় স্থাপনা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পাঁচগাছি ইউনিয়নের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।








