মোঃ হানিফ বিন রফিক: ঠাকুরগাঁওয়ের ফ্রিড মাতৃছায়া অটিস্টিক শিশু নিকেতন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাসহুরা বেগম (হুরা)-এর বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা। তবে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত এ প্রতিবন্ধী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি ১৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, নির্ধারিত সময়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে বাধা প্রদান, প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারের দেওয়া একাধিক ল্যাপটপ ব্যক্তিগতভাবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, সরকারি বরাদ্দের অর্থের অনিয়ম এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন প্রধান শিক্ষক মাসহুরা বেগম।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে একক কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাও উপেক্ষা করছেন। এমনকি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য, বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্দেশনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও তিনি মানছেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও নির্দেশনাও উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একের পর এক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক ভিন্নমত পোষণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করছেন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতেও বাধা সৃষ্টি করছেন।
অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষক আরও দাবি করেন, প্রধান শিক্ষক মাসহুরা বেগম (হুরা) অতীতে মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিদ্যালয়ে কেক কাটার আয়োজন করেন। এ ঘটনায় সদর থানা পুলিশ অভিযানও পরিচালনা করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিজের ভাই, ভাবিসহ পরিবারের অন্তত নয়জন সদস্যকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে পারিবারিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তারা জানান, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বিভিন্নভাবে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক মাসহুরা বেগম (হুরা)। তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয় ১৭ জনকে নিয়োগ দিয়ে ঠিক করেনি। আর জেলা প্রশাসকের কর্মকর্তা যদি পারেন, আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, “প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তাকে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে জেলা প্রশাসনের পক্ষে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে কিছুটা সময় লাগছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ চিঠি পাঠানো হবে।”
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শিক্ষা মহল ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।








