মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে যোগদান করেন ইকবাল হাসান। যোগদানের সময় সামনে ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ছিল চাপ, উৎকণ্ঠা ও চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেন— “নির্বাচনে কেউ পাশে না থাকলেও, এমনকি সেনাবাহিনী, পুলিশ বা র্যাব কেউ না থাকলেও আমি একাই আপনাদের আমানত—ভোট রক্ষা করব। শেষ একজন মানুষ মাঠে থাকলেও সে আমি থাকব।”
তার এই দৃঢ় প্রত্যয়ে দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত সাধারণ ভোটারদের মাঝে ফিরে আসে আস্থা। নির্বাচনের আগের রাতে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত, তখন তিনি নিজেই রাস্তায় নেমে কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। সারা রাত ঘুরে ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পরদিন শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়।
নির্বাচনী দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তিনি নিয়মিত ছুটে গেছেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। কখনো প্রত্যন্ত গ্রামের অসহায় পরিবারের পাশে, কখনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায়, আবার কখনো চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীর খোঁজ নিতে। প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি মানুষের কথা শোনার উদ্যোগ তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
রাতের আঁধারে নাইটগার্ডের পাশে বসে গল্প করা, সড়ক পরিষ্কার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া কিংবা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দাঁড়িয়ে পড়া—এসব কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে কুষ্টিয়ার অন্যতম মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে অভিহিত করেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “দুনিয়াদারির দুইটা টাকার জন্য এখানে আসিনি। এসেছি মানুষের জন্য কিছু করতে। যাদের করের টাকায় আমার রুটি-রুজি, তাদের সেবা করাই আমার দায়িত্ব। আমার কলম কেউ কিনতে পারবে না।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে কুষ্টিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল টালমাটাল। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ব্যাপক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বদলি হন তিনজন জেলা প্রশাসক। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিয়ে ইকবাল হাসান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুরু করেন নিয়মিত মনিটরিং।
কুষ্টিয়া পৌরসভার এক অনুষ্ঠানে ব্যয়বহুল চেয়ার দেখে তিনি মন্তব্য করেন, “এত বড় চেয়ার দরকার ছিল না। এটা জনগণের টাকার অপচয়।” সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি নোট রাখতে বলেন তিনি।
রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে প্রতিদিন ৬৫০ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা রয়েছে বলে জানা গেছে। সাধারণ মানুষ এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। প্রবাসী কুষ্টিয়াবাসী জয় নিহাল সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “গভীর রাতে সাধারণ মানুষের খোঁজ নেওয়ার দৃশ্যটি শুধু একটি ছবি নয়, এটি একটি বার্তা—প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের শাসক নন, বরং সেবক।”
অল্প সময়েই মানবিকতা, সাহসিকতা ও দৃঢ় প্রশাসনিক অবস্থানের মাধ্যমে কুষ্টিয়ার মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন জেলা প্রশাসক ইকবাল হাসান। তিনি শুধু দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করছেন না, বরং মানুষের মন জয় করে এক নীরব পরিবর্তনের গল্প লিখে চলেছেন প্রতিদিন।










