আলমডাঙ্গায় অনুসন্ধানী নিউজে চাপে রহিম মাস্টার, উল্টো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুর রহিম ওরফে ‘রহিম মাস্টার’-কে ঘিরে প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জেরে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পর এবার অভিযুক্ত শিক্ষক উল্টো গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধেই পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণ তার অভিযোগের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কুষ্টিয়া জেলার ঝাউদিয়া আস্তানগর গ্রামের বাসিন্দা মোছাঃ প্রীতি সিনহার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে রহিম মাস্টার তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিস-এ চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। ভুক্তভোগীর দাবি, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মোট পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং প্রথম ধাপে তিন লাখ টাকা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চাকরির কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং টাকা ফেরত চাইলে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, চাকরির অজুহাতে বিভিন্ন স্থানে দেখা করার প্রস্তাব, আবাসিক হোটেলে নেওয়ার চেষ্টা এবং অনৈতিক সম্পর্কের চাপ প্রয়োগ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান। গণমাধ্যমকর্মী এম সনজু আহমেদ জানান, ভুক্তভোগী প্রীতি সিনহা প্রথমে তাদের নিউজ পোর্টালের ফেসবুক ঠিকানায় যোগাযোগ করেন। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সাংবাদিক হিসেবে তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা লেনদেনের তথ্য ও কথোপকথনের প্রমাণ। চাকরি দেওয়ার আশ্বাস সংক্রান্ত বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য। ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে বিভিন্ন স্থানে দেখা করার প্রস্তাব। আবাসিক হোটেলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কিত তথ্যসূত্র। সাংবাদিকের দাবি, এসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেই ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযুক্তের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর রহিম মাস্টার পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ দায়ের করে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ভুয়া ও মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তবে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রকাশের আগে অভিযুক্তকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার অস্বীকারের বক্তব্যও প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

সাংবাদিক মহলের প্রশ্ন— যদি অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হয়, তবে প্রমাণ ও তদন্তের মাধ্যমে তা খণ্ডনের সুযোগ ছিল। কিন্তু অনুসন্ধান চলাকালেই বা প্রকাশের পরপরই গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা—তা কি মূল অভিযোগ থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা? প্রীতি সিনহা লিখিত অভিযোগে আর্থিক ক্ষতি, মানসিক নির্যাতন ও অনৈতিক প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। এম সনজু আহমেদ বলেন, “আমি একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে অভিযোগ পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি।” রহিম মাস্টার সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এখন মূল প্রশ্ন—চাকরির নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ এবং এরপর গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ—এই ধারাবাহিকতায় প্রকৃত সত্য কী? স্থানীয়দের মতে, যদি অভিযোগ সত্য হয় তবে এটি শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা নয়; বরং একজন শিক্ষকের নৈতিক অবস্থান ও শিক্ষা ব্যবস্থার মর্যাদার সঙ্গে জড়িত গুরুতর বিষয়। অন্যদিকে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ঘটনার অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে—পরবর্তী চতুর্থ পর্বে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28