ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের ভেতরের রাজনীতি,ডিজিটাল প্রচারণা, নীরব গ্রুপিং ও বাস্তব ক্ষমতার লড়াই।
Spread the love

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জকে কেন্দ্র করে গঠিত ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের নির্বাচনী মাঠ এখন কার্যত “সবাই বনাম সবাই”। আগের মতো পোস্টার-ফেস্টুন, মাইকিং আর পথসভা আছে ঠিকই, কিন্তু এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো মাঠের পাশাপাশি ডিজিটাল ময়দানও সমানতালে উত্তপ্ত। ফেসবুক লাইভ, রিলস, টিকটক ক্লিপ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ—সবখানেই প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ছে। ফলে রাজনীতির চরিত্রও বদলাচ্ছে। প্রশ্নটা আর কে কত বড় মিছিল করল বা কার পোস্টার কত জায়গায় লাগানো হলো, তা নয়; প্রশ্নটা এখন অনেক বেশি কৌশলগত—কে গল্পটা নিয়ন্ত্রণ করছে, কে জনমত গড়ে তুলছে, আর কে নীরবে ক্ষমতার কাঠামো দখলে রাখছে। প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো দৃশ্যমানতার যুদ্ধ। প্রতিটি প্রার্থী প্রায় প্রতিদিনই নিজের জনসংযোগের মুহূর্তগুলো অনলাইনে তুলে ধরছেন—কখনো বাজারে দোকানদারের সঙ্গে হাত মেলানো, কখনো উঠান বৈঠকে বয়স্কদের পাশে বসে থাকা, কখনো তরুণদের সঙ্গে সেলফি বা মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা। এগুলো নিছক ছবি বা ভিডিও নয়; এগুলো পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা নির্বাচনী ব্র্যান্ডিং কন্টেন্ট। বার্তাটা স্পষ্ট—“আমি মাঠে আছি, আমি মানুষের সঙ্গে আছি, আমিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।” বাস্তবে এই সংযোগ কতটা গভীর বা কতটা টেকসই, সেটা পরিমাপ করা কঠিন; কিন্তু অনলাইনে উপস্থিতির ঘনত্ব দিয়ে একটি মোমেন্টাম তৈরি করা হচ্ছে, যা অনেক সময় বাস্তব শক্তির চেয়েও বড় বলে মনে হয়। দ্বিতীয়ত, এবারের প্রচারণায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে দুটি সমান্তরাল কৌশল। একদল প্রার্থী নিজেদের উন্নয়নকর্মকাণ্ড, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির তালিকা তুলে ধরছেন—রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন। তাঁরা বোঝাতে চাইছেন, তাঁরাই “নিরাপদ ও পরীক্ষিত পছন্দ”। অন্যদিকে আরেক দল তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক—তাঁরা প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা, অতীতের বিতর্ক, দলীয় কোন্দল বা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আনছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই দুই ধারার কন্টেন্টই সমানতালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে ভোটার শুধু প্রার্থীদের মুখ দেখছেন না; তাঁরা দেখছেন ন্যারেটিভের যুদ্ধ—কে পরিবর্তনের প্রতীক, আর কে পুরোনো ব্যবস্থার ধারক। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ ভোটার ও অনলাইন জনমত। পীরগঞ্জ অঞ্চলেও স্মার্টফোন ব্যবহারকারী তরুণদের সংখ্যা এখন আর কম নয়। তাঁদের বড় একটি অংশের কাছে পোস্টার বা লিফলেটের চেয়ে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও বা একটি ভাইরাল ক্লিপ অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। অনেক প্রার্থী বিষয়টি বুঝে মাইক্রো-ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন—কখনো শিক্ষার্থীদের নিয়ে কন্টেন্ট, কখনো খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক আয়োজন, কখনো প্রবাসী পরিবারের আবেগঘন গল্প। এর ফলে প্রচারণা আগের চেয়ে অনেক বেশি টার্গেটেড হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেশি পোলারাইজডও হয়ে উঠছে। কারণ প্রত্যেক গোষ্ঠীকে আলাদা আলাদা গল্প শোনাতে গিয়ে সামগ্রিক সামাজিক ঐক্যের জায়গাটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। চতুর্থত, মাঠের বাস্তব জনসংযোগ আর অনলাইনের দৃশ্যমানতার মধ্যে একটি মৌলিক ফারাক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনলাইনে কাউকে খুব সক্রিয় ও জনপ্রিয় মনে হলেও বাস্তবে তাঁর সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হতে পারে। আবার কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলনামূলক নীরব, কিন্তু ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে তাঁর শক্ত, পরীক্ষিত নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে এই নির্বাচনে একটি বড় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে—“ভিজিবিলিটি” আর “ভোটেবিলিটি” এক জিনিস নয়। অনেক প্রার্থী হয়তো এই ফাঁদে পড়ে কন্টেন্টকেই রাজনীতির বিকল্প ভাবছেন, যা শেষ পর্যন্ত কৌশলগতভাবে বড় ভুল প্রমাণ হতে পারে। এই পুরো প্রচারণার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো—চকচকে পোস্ট আর হাসিমুখের ছবির আড়ালে চলছে ভেতরের গ্রুপিং, প্রভাব বিস্তারের লড়াই এবং নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। প্রকাশ্যে সবাই উন্নয়ন আর জনসেবার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে কে কোন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করবে, কে কোন ভোটব্যাংক ভাঙবে বা দখলে রাখবে—সেই হিসাব-নিকাশই আসল রাজনীতি। ডিজিটাল প্রচারণা অনেক সময় এই সংঘাতকে আড়াল করে দেয়, আবার কখনো উসকে দেয়ও। কোনো একটি পোস্ট বা ভিডিও থেকেই শুরু হয়ে যেতে পারে পাল্টাপাল্টি কাদা ছোড়াছুড়ি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো নীরব। তাঁরা প্রকাশ্যে কারও পক্ষে কথা বলছেন না, অনলাইনে কমেন্টও করছেন না। কিন্তু তাঁরাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবেন। এই নীরব ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া মারাত্মক ভুল হতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের নির্বাচন এখন আর কেবল ব্যালটের লড়াই নয়; এটি ইমেজ, ন্যারেটিভ, সংগঠন, গ্রুপিং এবং ডিজিটাল প্রভাবের সম্মিলিত যুদ্ধ। যে প্রার্থী মাঠের বাস্তব কাঠামোকে অনলাইনের গল্প বলার শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে থাকবেন। আর যে শুধু ছবি পোস্ট করে ভাববেন কাজ শেষ, তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝবেন—নির্বাচন জেতা যায় ক্যামেরায় নয়, বিশ্বাস, নিয়ন্ত্রণ আর সংগঠনে। এই দ্বন্দ্বের ফলই বলে দেবে, পীরগঞ্জের রাজনীতিতে এবার সত্যিকারের পরিবর্তন আসছে, নাকি কেবল প্রচারণার রঙ বদলাচ্ছে। চাও তো আমি এটাকে আরও তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী টোনে বা নির্দিষ্ট ইঙ্গিত রেখে রিরাইট করে দিতে পারি যেন এটা “পলিটিক্যাল ইনসাইডার অ্যানালাইসিস” হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31