
#SFTVNewsBD:চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। খুলনাগামী ট্রেনের ছাদে উঠে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করা এক পথশিশুর জীবন শেষ হয়েছে মর্মান্তিকভাবে। মাত্র ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুটি ট্রেনের ছাদে বসে ছিল—স্বপ্ন হয়তো ছোট, কিন্তু আশা ছিল বেঁচে থাকার। সেই আশাই শেষ হয়ে গেল আলমডাঙ্গা লালব্রিজের আগে ঝুলন্ত তারে গলা পেঁচিয়ে। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সকাল প্রায় ৯টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে থাকা অবস্থায় উপরে ঝুলে থাকা রেলের টেলিফোন তারে শিশুটির গলা পেঁচিয়ে যায়। মুহূর্তেই সে ট্রেনের ছাদেই পড়ে যায় অচেতন অবস্থায়। ট্রেনটি আলমডাঙ্গা স্টেশনে পৌঁছালে শিশুটির সঙ্গে থাকা আরেক পথশিশু চিৎকার করে যাত্রীদের সাহায্য চান। পরে স্থানীয়রা তাদের সহায়তায় আহত শিশুটিকে দ্রুত আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু হয় তার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশনে বসবাসকারী ছয়জন পথশিশুর একটি দল সোমবার রাতে খুলনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ট্রেনে উঠে। জীবনের কষ্ট, ক্ষুধা আর আশ্রয়ের অভাবে তারা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতো, কখনো ট্রেনে, কখনো স্টেশনের ফুটপাথে। সেই রাতে তারা ভেবেছিল খুলনায় গিয়ে হয়তো কিছু কাজ পাবে, কিছুদিন ভালোভাবে থাকতে পারবে। কিন্তু তারা যে ট্রেনে উঠেছিল, সেটি আসলে রাজশাহী গামী ছিল। পথে পোড়াদহ রেলস্টেশনে নামেন দুইজন শিশু, পরে খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেসে উঠে তারা। আর সেই ট্রেনেই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা। শিশুটির সঙ্গে থাকা অপর এক পথশিশু জানায়, নিহত শিশুটির নাম শাওন। তারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে বসবাস করত। সেখানে প্রতিদিন তারা খাবারের জন্য ভিক্ষা করত বা ছোটখাটো কাজ করত। শিশুটি আরও জানায়, শাওন সম্ভবত কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। শাওনের সহযাত্রী শিশু কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমরা স্টেশনে একসাথে থাকতাম। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করতাম। খুলনায় যাওয়ার কথা ছিল কাজ খুঁজতে। কিন্তু ভাইটা (শাওন) আর ফিরল না…”ঘটনার খবর পেয়ে আলমডাঙ্গা থানার পুলিশ ও পোড়াদহ রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে লাশের সুরতহাল তৈরি করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ওসমানপুর পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ আলমগীর হোসেন বলেন, “আমরা শিশুটির পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। ধারণা করা হচ্ছে, সে ঢাকার কমলাপুর এলাকার পথশিশুদের একজন। তার মৃত্যুর খবর জানার পর এলাকাজুড়ে শোক নেমে এসেছে।” এই মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে গেছে আলমডাঙ্গা রেলপথ এলাকা। স্থানীয় এক যাত্রী বলেন,“ট্রেনের ছাদ থেকে একটা ছোট ছেলে হঠাৎ পড়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। এত ছোট একটা ছেলের এভাবে মারা যাওয়া খুব কষ্টের।”একটি শিশুর মৃত্যু, কিন্তু সেই মৃত্যু যেন পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেল।
স্টেশনের ধারে যে শিশুরা প্রতিদিন রেললাইনের পাশে ঘুমায়, তারা জানে না আগামী দিনটা আদৌ তাদের জন্য ভোর হবে কিনা। শাওনের মৃত্যু তাদের এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে বেঁচে থাকা মানে প্রতিনিয়ত লড়াই।
অচেনা শহরে অজানা যাত্রার পথে নিজের জীবনের গল্প শেষ করে গেল এক ছোট্ট পথশিশু। তার মৃত্যু যেন এক নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আমাদের সমাজের দিকে—কেন আজও এই শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নেই, কেন তারা এখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে?










