বাংলাদেশের চেয়ে কম দামে ভারতে কীভাবে ইলিশ রফতানি হচ্ছে?

দেশের বাজারে যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, কাগজে-কলমে তার চেয়ে কম দামে ভারতে রফতানি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—রফতানিকারকরা কি তাহলে লোকসান গুনছেন? নাকি অন্য কোনো কৌশলে বাড়তি মুনাফা তুলছেন? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ইলিশ রফতানির আড়ালে চলছে বড়সড় হুন্ডি ব্যবসা

রফতানি নীতি ও নির্ধারিত দাম

২০১৯ সাল থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ বিবেচনায় প্রতিবছর ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়ে আসছে সরকার। চলতি বছরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছে ৩৭ জন ব্যবসায়ীকে।

এইবার প্রতি কেজি ইলিশের ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২.৫০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১,৫০০ টাকা। তবে স্থানীয় বাজারে একই সাইজের (৯০০ গ্রাম+) ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে প্রায় ১,৮০০ টাকা। অর্থাৎ, রফতানির কাগজে দাম স্থানীয় বাজারের চেয়ে প্রায় ২৫০ টাকা কম

বাজার বাস্তবতা

বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এলসি সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৭৫ হাজার টাকায় (প্রতি কেজি ১,৮০০ টাকা)। অথচ রফতানির কাগজে মণপ্রতি মূল্য দেখানো হচ্ছে ৬০ হাজার টাকা। স্থানীয় আড়ৎদাররা বলছেন, রফতানিকারকরা বাজারদরেই মাছ কিনছেন; কাগজে কম দামে রফতানির বিষয়টি তাদের বোধগম্য নয়।

ভারতের বাজারে দাম বেশি

কলকাতায় বাংলাদেশের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ২ হাজার রুপি—বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২,৭০০ টাকা। ঢাকায় একই সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। ফলে কলকাতার বাজারে ইলিশের দাম গড়ে ৫০০ টাকা বেশি

হুন্ডির খেলা

মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, রফতানির কাগজে কম দাম দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কম আনা হচ্ছে। কিন্তু ভারতে বাজারমূল্যে বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে ফেরানো হয়।
বরিশালের এক রফতানিকারক বলেন, “বাংলাদেশ থেকে আমি ২ হাজার টাকায় কিনি, ভারতে বিক্রি করি ২,৫০০ টাকায়। কাগজে কম দাম দেখালেও কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা লাভ হুন্ডিতে দেশে আসে।”

একই ব্যক্তি রফতানিকারক ও আমদানিকারক

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যারা বাংলাদেশ থেকে রফতানি করছেন তাদের অনেকেই ভারতীয় আমদানিকারক হিসেবেও জড়িত। আবার অনেকের আত্মীয়-স্বজন ভারতে থেকে ব্যবসা করছেন। ফলে কম দামে কাগজে রফতানি দেখিয়ে বাজারমূল্যে বিক্রি করাই মূল ব্যবসায়িক কৌশল।

ভারত হয়ে অন্য দেশে

শুধু ভারতের বাজার নয়, কলকাতা হয়ে এই ইলিশ যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও। সরাসরি রফতানি অনুমতি না থাকায় ভারত হয়ে পাঠানো ব্যবসায়ীদের জন্য লাভজনক হয়ে উঠছে।

চোরাই পথে পাচার

রফতানির নির্ধারিত সময় শেষ হলেও পূজা-পার্বণে কালোবাজারে ইলিশ পাচার হয়। বিশেষত বড় সাইজের ইলিশ ভারতে পাচার বেশি হয়, কারণ কলকাতার বাজারে এর চাহিদা বেশি। অনেক সময় তেলাপিয়াসহ অন্যান্য মাছের ভেতরে লুকিয়েও ইলিশ পাচার হয়।

ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ

হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ২৬০ টাকা করে কম দেখানোয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনের ঝুঁকি রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও দেশ বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে।

বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সম্রাট বলেন, “কম মূল্যে দেখিয়ে রফতানির ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ কম হচ্ছে। এতে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”

বেনাপোল স্থলবন্দর মৎস্য ও মান-নিয়ন্ত্রণ অফিসার আসাওয়াদুল ইসলাম জানান,
“বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি কেজি ইলিশ ১২.৫ ডলারে রফতানির সুযোগ দিয়েছে। বাজারমূল্যের কমে রফতানি হলেও আমরা বাধা দিতে পারি না।”

এদিকে, গত ৯ দিনে ১০ জন রফতানিকারক বেনাপোল বন্দর দিয়ে ইতোমধ্যে ১০২ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে পাঠিয়েছেন।

সুত্র: সময় সংবাদ

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031