চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ কোটি টাকার হরিলুট — ৫ বছরে অপারেশন ছাড়াই দেখানো হয়েছে শত শত অপারেশন

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যসেবা না দিয়েও কাগজে-কলমে শত শত অপারেশন দেখানো হয়েছে। সরবরাহকৃত ওষুধ ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ, আর স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন থেকেও কেটে নেওয়া হয়েছে মোটা অংকের টাকা।

দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারে পাঁচ বছর ধরে কোনও প্রকৃত অপারেশন হয়নি। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি জানান, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, গত পাঁচ বছরে হাতে গোনা কিছু অপারেশন ছাড়া আর কিছুই হয়নি, সেগুলোরও কিছু তিনি নিজেই করেছেন।

তবে সরকারি পরিসংখ্যানে ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর শত শত অপারেশন দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ মোহাম্মদ শাহজাহান আলী বলেন, “পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় অপারেশন করা সম্ভব হয় না। যে পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়, সেটি মূলত স্কোর বাড়ানোর জন্য।”

সরকারি বরাদ্দের ওষুধ বিতরণেও চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের স্টোর থেকে বিতরণ করা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু মন্টিলুকাস্ট-১০ ট্যাবলেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪৬ হাজার পিস, যার প্রতিটির দাম ১৬.৯৯১ টাকা। অথচ রোগীরা এই ওষুধ পাননি।

ফার্মাসিস্ট ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, “এসব ওষুধ বিতরণ করতে চাইনি, কিন্তু স্টোরকিপার কাম বড়বাবু হুমায়ুন কবির আমাকে বাধ্য করেছেন।” এ বিষয়ে হুমায়ুন কবির জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশেই তিনি কাজ করেছেন।

ওষুধ রেজিস্টারে দেখা গেছে, গত দুই বছরে মন্টিলুকাস্ট-১০-এর কোনও রেকর্ড নেই। বরাদ্দ ছিল মন্টিলুকাস্ট-৫, সেটিও যথাযথভাবে বিতরণ হয়নি। বিতরণকৃত কিছু ভিটামিন ওষুধ, যেমন নিউট্রাম গোল্ড, ছিল সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রকৃত মজুরি থেকেও কর্তন করা হয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী একজন আয়ার দৈনিক মজুরি সাড়ে ৪০০ টাকা এবং সুইপারের ৫০০ টাকা হলেও, মাস শেষে তাঁদেরকে যথাক্রমে মাত্র ২ হাজার এবং সাড়ে ৬ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।

আয়া সেলিনা খাতুন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী সনি অভিযোগ করেন, “আমরা কোনো দৈনিক হাজিরা পাই না। মাস শেষে শুধু নগদ টাকা দিয়া যায়, সেটাও অনেক কম।”

হাসপাতালের ভেষজ বাগান তৈরির জন্য বরাদ্দ তিন লাখ টাকাও লোপাট হয়েছে। বাস্তবে বাগানটির তেমন কোনো চিহ্নই নেই।

এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপা, সাবেক বড়বাবু হাসান আহমেদ এবং বর্তমান স্টোরকিপার কাম বড়বাবু হুমায়ুন কবির। এ ছাড়া সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু হেনা মোস্তফা জামালের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

ডা. হেলেনা আক্তার নিপা বলেন, “অপারেশন থিয়েটার সংক্রান্ত সব তথ্য আমার জানা নেই। না দেখে কিছু বলা সম্ভব নয়। ওষুধ বিতরণের ক্ষেত্রে সব ইউনিয়ন সাবসেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, “অপারেশনের কাগজে যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে এবং বাস্তবের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।”

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ বলেন, “অপারেশন না করেও স্কোর বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031