আজ একুশে ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবসও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
Spread the love

অমর একুশে আজ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমাদের তরুণ ছাত্র যুবকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ।

তাদের সেই সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ জাতি হিসেবে আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসে অবিস্মরণীয় করেছে। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাষা হিসেবে বাংলা আজ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশে এটি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আজ বুধবার শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হবে ভাষা আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরদের। শ্রদ্ধা জানানো হবে ভাষা আন্দোলনের উৎসপুরুষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সংগঠক অধ্যাপক আবুল কাসেম থেকে শুরু করে ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল মতিন, গাজিউল হক, অলি আহাদ, শামসুল আলম, গোলাম মওলা, আব্দুল গফুর, আনোয়ারুল হক খান, আলী আজমল, ইব্রাহিম তাহাসহ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জানা-অজানা সবাইকে। আজ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হবে। প্রতিটি শহীদ মিনার ভরে উঠবে ফুলে ফুলে। ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে উলানিয়া হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শহীদ মিনারে। সহ দেশের প্রতিটি জেলার সব অলিগলি রাজপথ থেকে খালি পায়ে ফুল হাতে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ছুটবে নিকটস্থ শহীদ মিনারের দিকে। তাদের কণ্ঠে হবে ভাষাশহীদদের স্মরণে লেখা গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’। দিবসটি পালন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি , প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের ডাক দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদও। হরতাল প্রতিহত করতে তৎকালীন সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি বৈঠকে বসেন ভাষা আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ। বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা তা নিয়ে নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রনেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়ায় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি উপস্থিত ছাত্রদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে রাতেই অনেক ছাত্রনেতা পরের দিন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই বিস্ফোরণোন্মুখ ছাত্র-যুবকদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্য দেন শামসুল হক, তোয়াহা, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ চৌধুরী, শাহাবুদ্দীন আহমদ খালেদ, আব্দুল মতিন। ঘণ্টা খানেক সভার কাজ চলার পর সভাপতির বক্তব্যে গাজিউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে মত দেন। এতে সম্মতি দেন উপস্থিত সব ছাত্র-জনতা।
পাঁচজন করে ছাত্র বের হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হয়। ১০ জনের প্রথম তাকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। এভাবে দ্বিতীয় ১০ জনের গ্রুপটির নেতৃত্ব দেন ইসলামী ভ্রাতৃসঙ্ঘের নেতা ইব্রাহিম তাহা ও আব্দুস সামাদ, তৃতীয় দলের নেতৃত্ব দেন আনোয়ারুল হক ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়।বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রদের পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কলেজ এলাকায় প্রথম ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এতে ছাত্ররা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেল ৪টায় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত হন রফিকউদ্দিন আহমদ (তার নাম মুহম্মদ সালাহুদ্দীন নিয়ে বিভ্রান্তি আছে)। রাত ৮টার পরে আহতদের মধ্যে মারা যান বিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত এবং গফরগাঁওয়ের আব্দুল জব্বার।
সাংবাদিক সে সময় ছিলেন এবং একুশের ঘটনা জানতে পারেন। একুশের রাতে তিনি পুলিশের গাড়িতে ৯টি লাশ তুলতে দেখেন। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকায় আটজন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। তবে পরে ইতিহাস অন্বেষণে ছয়জন শহীদের প্রকৃত নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। ওপরে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা বাদে বাকিরা হলেন ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান, নবাবপুর রোডের বাসিন্দা সরকারি অফিসের পিয়ন আব্দুস সালাম।
আজ সরকারি ছুটি। প্রতি বছরের মতো এবারো একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে উদযাপনের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে সঠিক নিয়মে, সঠিক রঙ ও মাপে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কুরআনখানির আয়োজনসহ দেশের সব উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়ার আয়োজন করা হবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং দিবসটি পালনে নিয়োজিত সব প্রতিষ্ঠান ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারকরণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা-অধিকার রক্ষা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত শহীদদের রক্তে রঞ্জিত দিবসটি।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31