পৌষের শীতে কাঞ্চনজঙ্ঘা

পৌষের শীতে কাঞ্চনজঙ্ঘা 

 

ডিসেম্বরের শেষ পৌষের শুরু! এই সময়ে উত্তরাঞ্চলে জেঁকে বসে শীত। হেমন্তের সোনালী পাখায় ভর করে আসে শীত। কিন্তু শীতের প্রকোপে বিবর্ণ ও রুক্ষ্ম হয়ে যায় সবুজ মাঠ,ঘাট। বিশেষ করে কুয়াশার চাঁদর মুড়ি দিয়ে থাকে হিমালয়ের লজ্জাবতী কন্যা পঞ্চগড়।
বেশি লজ্জা পেলে আবার পঞ্চগড় দেশজুড়ে করে ফেলে সর্বনিম্ন ঠান্ডার রেকর্ডও। দেশের সর্বনিম্ন হাঁড় কাপানো তাপমাত্রা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর দিনটি এখনো মনে আছে। বাঙ্গালীদের জীবনের শীতের আবেদন চিরন্তন।
গ্রীষ্মের তাপদাহ ও বর্ষার অবিরাম বর্ষণের পর হেমন্তের ঝিরিঝিরি বাতাসে ভর করে যখন শীত আসে, প্রতিটি বাঙ্গালীর মন সজীবতায় ভরে উঠে। কৃষকের ঘরে হেমন্তে নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নবান্ন উৎসব ও পিঠা উৎসব। বাংলার শীতকাল আর পিঠা যেন একসূত্রে গাঁথা।

কুয়াশার চাঁদরে মুড়ে পিঠাপুলি নিয়ে পঞ্চগড়ে পৌষ এসেছেও। ঠান্ডার তীব্রতা তেমন না থাকলেও কয়েকদিন কুয়াশায় ঢেকে ছিলো উত্তরাঞ্চল । এর মধ্যে একদিন ঘুম ভাঙল তীব্র আলোর ঝলকানিতে। জানালা গলিয়ে শীতের সকালের ঝলমলে আলো এসে পড়েছে মুখে। লেপ কম্বলের আরামে শুয়ে একটু অবাক ই হলাম।
বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে গিয়ে দেখি ঝাঁ চকচকে নীলাকাশ। একদম শরৎ হেমন্তের মত ঝলমলে দিন। কুশায়ার নাম গন্ধ নেই। এতো তো পাহাড় পর্বত দেখা দিন। ফটোগ্রাফারের মন ঠিক ছবিতে গিয়ে ঠেকেছে। পৌষের পিঠা দিয়ে নাশতা করে খোলা মাঠে গিয়ে দেখি ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। একেবারে শরৎ এর মত। বরঞ্চ শরৎ এর চেয়েও সুন্দর বৈচিত্র্যময়। রঙ্গীন মেঘমালার মাঝে দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের তৃতীয় পর্বতশৃঙ্গ।

তাহলে সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গের কি খবর। গ্রেট মাউন্ট এভারেস্ট এর! মনে আশা জেগেছিলো এই বছর যদি আরেকবার দেখা পাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গকে। না ভাগ্য এতটাও সুপ্রসন্ন নয়। সে দুঃখ যদিও পৌষের কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘুচিয়ে দিয়েছে ।

দলেবলে আরেকবার হলো পর্বতাভিযান। আরেকবার আমরা দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখলাম তুষারমন্ডিত হিমালয়ের অন্যতম সুন্দর শুভ্র তুষারমৌলী কাঞ্চনজঙ্ঘা। ডিসেম্বরের শীতে আবার দেখতে পেলাম ইয়ালুংকাং, রাথং, কাবরু, কুম্ভকর্ণ পর্বত শৃঙ্গ সহ অংলাথাং হিমবাহ। এ যেনো ঠিক ভাপা পিঠায় নারিকেল গুড় !

পৌষ ভোরের কনকনে ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে দেখছি পৃথিবীর নবীনতম কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর পর্বতমালা হিমালয়। এর আগেও দেখেছি এই সময়ে কিন্তু এবার হিমালয় যেন আনকোড়া নতুন ভাবে সেজে এসেছে। সাগরের গর্ভে জন্ম নেয়া এই পর্বতসারি কে দেখলে মনে হয় যেন ওরা বরাবরই ওখানেই রয়েছে। এই নীল গ্রহ তৈরীর আদি থেকেই যেন প্রকৃতি তাঁদের সাজিয়ে রেখেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। এই সৃষ্টির পিছনে রয়েছে এক বিপুল পরিমাণ শক্তির খেলা। যে শক্তি এখনো হিমালয়কে শক্তি দিয়ে যাচ্ছে সেই শক্তিতেই হিমালয়ের দেহের এখনো কাঠামো ও গঠনগত পরিবর্তন চলছে অনবরত।

নিজেকে ভাঙ্গা গড়ার শত ব্যস্ততার মাঝে মধ্য এশিয়ার হাড় হিম করা বায়ুস্রোতের বিরুদ্ধে এক দুর্লোঙ্ঘ বাধার প্রাচীর হয়ে আছে হিমালয় পর্বতমালা। এই পর্বতমালা না হলে আমাদের উপমহাদেশ সাইবেরিয়ার মতই অতি রুক্ষ্ম শীতল অঞ্চলে পরিণত হত। এই ষড়ঋতুর বর্ষা,শরৎ বসন্তের মত নানান রূপ হয়ত দেখতে পেতাম না আমরা।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত, সর্বোচ্চ গিরিখাত, সর্বোচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী প্রাণী সব মিলিয়ে হিমালয় তুলনাহীন। আর এই হিমালয় পর্বতমালা নিজ দেশ থেকে দেখার আনন্দও তুলনাহীন। এই আনন্দও হিমালয় সমান।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031