
মেহেরপুর প্রতিনিধি: সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া আর আইনি জটিলতায় দীর্ঘ ৪৫ বছর বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন মেয়ে। অবশেষে শতবর্ষী বাবার মৃত্যুর পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মানবিক উদ্যোগে শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখার সুযোগ পেলেন তিনি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় বাবা-মেয়ের এই শেষ বিদায়ের দৃশ্য উপস্থিত সবার চোখে অশ্রু এনে দেয়।বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বেলতলা এলাকার ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারসংলগ্ন শূন্যরেখায় এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। সেখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা প্রয়াত মনিরউদ্দিন শেখের মরদেহ নিয়ে আসা হলে তাঁর বড় মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন শেষবারের মতো বাবাকে দেখেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানান।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মনিরউদ্দিন শেখ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ছাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর। তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন।প্রায় ৪৫ বছর আগে মনিরউদ্দিন শেখের বড় মেয়ে ফেরদৌসী খাতুনের বিয়ে হয় বাংলাদেশের মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের সোনাপুর নতুনপাড়া গ্রামের ইসরাফিলের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও আইনি জটিলতায় ভারতের নিজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাৎ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সীমান্তের বিধিনিষেধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভেঙে পড়েন ফেরদৌসী। শেষবারের মতো বাবার মরদেহ দেখার আকুতি জানিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার বিকেলে মনিরউদ্দিন শেখের মরদেহ সীমান্তের শূন্যরেখায় আনা হয়। সেখানে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর বাবার মরদেহের কাছে গিয়ে শেষবারের মতো তাঁকে ছুঁয়ে দেখেন ফেরদৌসী খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবাকে শেষ বিদায় জানান তিনি।এ মানবিক কার্যক্রমে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন মুজিবনগর বিজিবির কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে বিএসএফের সহকারী উপপরিদর্শক সুনীল কুমারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল উপস্থিত থেকে পুরো কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে।দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন মানবিক উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হন সীমান্তে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, সীমান্তের কাঁটাতার দুই দেশকে আলাদা করলেও রক্তের সম্পর্ক ও মানবিক অনুভূতিকে আলাদা করতে পারেনি।