
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা আইসিটি অফিসার ও মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মাহমুদুর রহমান মাহমুদের (৩৫) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবতা ফাউন্ডেশন’।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এই দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে মানবতা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট খন্দকার অহিদূল আলম (মনি খন্দকার) লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় নিহত মাহমুদুর রহমানের পিতা-মাতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গত ১৯ জুন সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে জীবননগর উপজেলার আশতলা পাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে উপজেলা আইসিটি অফিসার মাহমুদুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে জীবননগর থানা পুলিশ। ওই দিনই নিহতের পিতা, মৎস্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন—নিহতের স্ত্রী নাসরিন আক্তার ইতি, স্ত্রীর বড় ভাই মো. জাহাঙ্গীর আলম, শাশুড়ি মোছা. জাহানারা খাতুন এবং স্ত্রীর দুলাভাই নাহিদ হোসেন। পরবর্তীতে গত ২৪ জুন আইনি সহায়তার জন্য ভিকটিমের পরিবার মানবতা ফাউন্ডেশনের দ্বারস্থ হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ করা হয় যে, লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত ফ্ল্যাটটি পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়নি এবং নিহতের পিতা-মাতাকেও সময়মতো বিষয়টি অবহিত করা হয়নি। এর ফলে অভিযুক্তরা ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে অনায়াসে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও জীবননগর থানা পুলিশের তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বাদীপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মামলাটি (জিআর-১৪২/২৬) জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-তে হস্তান্তর করেন।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মাহমুদুর রহমান ও তার স্ত্রী নাসরিন আক্তার ইতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দাম্পত্য কলহ চলছিল। স্ত্রী তাকে নিজের পিতা-মাতার সঙ্গে দেখা করতে দিতেন না এবং শ্বশুর-শাশুড়িকেও বাসায় যেতে বাধা দিতেন। পরিবারের অভিযোগ, ইতির প্ররোচনায় তার বড় ভাই, মা ও দুলাভাই প্রায়ই বাসায় গিয়ে মাহমুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ঘটনার আগের দিন ১৮ জুন রাত সাড়ে ১০টা এবং ঘটনার দিন ১৯ জুন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আসামিরা মাহমুদের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাকে "গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারিস না" বলে চরমভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই পাশের কক্ষ থেকে মাহমুদের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনা হয়। চার বছর বয়সী এক সন্তানের জনক মাহমুদের স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নিহতের পরিবার প্রতিবেশী, সহকর্মী ও বন্ধুদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করে, স্ত্রীর বর্তমান গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে মাহমুদের মনে গভীর সন্দেহ ছিল এবং জীবদ্দশায় তিনি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এই দাম্পত্য সমস্যার কথা প্রকাশ করেছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, স্ত্রী ও মামলার অন্যান্য আসামিরা কোনো কথিত পরপুরুষের সহায়তায় মাহমুদকে নির্যাতন করে হত্যা করার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে সাজিয়ে থাকতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে মানবতা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রতি মামলার সকল সন্দেহজনক ও রহস্যজনক বিষয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে একটি নিরপেক্ষ ও সঠিক চার্জশিট দাখিলের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং ভিকটিমের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমকর্মীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য: সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ নিহতের পরিবার ও মানবতা ফাউন্ডেশনের বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের ওপরই চূড়ান্ত সত্য নির্ভর করবে।