
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা যেখানে এ বছর প্রায় ৯,৯৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদ হয়েছিল, সেখানে গতরাতের আকস্মিক শিলাবৃষ্টি যেন কৃষকের সমস্ত হিসাব-নিকাশ ভেঙে দিয়েছে। মাঠজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য—সবুজ ভুট্টার গাছ মাটিতে নুয়ে পড়েছে, অনেক জায়গায় শিষ ভেঙে গেছে, কোথাও আবার গাছের গোড়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত।সকালে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ জমিতেই ভুট্টার গাছ এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। অনেক গাছের পাতা ছিঁড়ে গেছে, শিষগুলো মাটির সঙ্গে লেগে নষ্ট হওয়ার পথে। কৃষকেরা হতাশ চোখে ক্ষতির পরিমাণ মাপছেন, কিন্তু প্রকৃত ক্ষতির হিসাব এখনো নির্ধারণ করা কঠিন।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, “গতরাতের শিলাবৃষ্টি ছিল অস্বাভাবিক মাত্রার। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, উপজেলায় ভুট্টার একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”তিনি আরও জানান, যেসব গাছ পুরোপুরি মাটিতে পড়ে গেছে, সেগুলোর পুনরুদ্ধার কঠিন। তবে যেসব গাছ আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত সোজা করে মাটি চাপা দিলে কিছুটা রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।জনৈক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা,৯ নম্বর ইউনিয়নের মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন,তিনি বলেন, “আমরা ভোর থেকেই কৃষকদের সঙ্গে মাঠে কাজ করছি। অনেক জায়গায় গাছ পড়ে গেলেও শিকড় এখনো মাটিতে আছে। সঠিক পরিচর্যা দিলে কিছু ফসল বাঁচানো সম্ভব। আমরা কৃষকদের গাছ সোজা করা, জমির পানি নিষ্কাশন ও রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।”৭ নম্বর ইউনিয়নের এক কৃষক জানান, “এই ভুট্টা ছিল আমাদের প্রধান আশা। বীজ, সার, শ্রম সব মিলিয়ে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু এক রাতের শিলাবৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, সেটাই বড় চিন্তা।”৮ নম্বর ইউনিয়নের আরেক কৃষকের কণ্ঠে ছিল হতাশা আর ক্ষোভের মিশ্রণ, “আবহাওয়ার এমন আচরণ আগে খুব কম দেখেছি। গাছগুলো যখন ঠিকমতো ফলন দিতে শুরু করেছে, তখনই এই বিপর্যয়। সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে এই ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব না।”৯ নম্বর ইউনিয়নের এক প্রবীণ কৃষক বলেন, “আমার জীবনে অনেক ঝড়-বৃষ্টি দেখেছি, কিন্তু এমন শিলাবৃষ্টি খুব কম হয়েছে। ভুট্টার শিষগুলো ভেঙে গেছে, গাছ মাটিতে পড়ে আছে। এই ফসল থেকে আর লাভ হবে বলে মনে হয় না।”কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কৃষকেরা চাইছেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ যেমন সহজ শর্তে ঋণ, বীজ সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণ।বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন অপ্রত্যাশিত আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, যা কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষকদের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
পীরগঞ্জের এই ভুট্টাক্ষেত যেন শুধু একটি এলাকার কৃষি ক্ষতির গল্প নয়, এটি দেশের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার একটি প্রতিচ্ছবি। এক রাতের শিলাবৃষ্টি যেমন হাজারো কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে, তেমনি সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা সেই স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তুলতেও পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই এই বিপর্যয়ের পর কৃষক কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, আর তাদের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।