
ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান মাসের পর মাস নয়, বরং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সফলভাবে শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ফ্রান্সে জি-৭ (G7) ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এই তথ্য জানানমার্কো রুবিও জানান, ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি জোটের সামরিক অভিযান অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "আমরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযানের সমাপ্তি টানতে পারব বলে আশা করছি।" এই লক্ষ্য অর্জনে বর্তমানে কোনো স্থলবাহিনী (Ground Troops) ব্যবহারের প্রয়োজন নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। তবে ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ দিতে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে কিছু অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখা হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।সংবাদ সম্মেলনে রুবিও সতর্ক করে বলেন, ইরান বিশ্ববাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'হরমুজ প্রণালী'তে অবৈধ টোল ব্যবস্থা চালু করার পাঁয়তারা করছে। তিনি এটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন। এদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে শত্রু দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং তিনটি জাহাজকে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে।যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের একটি ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এরই প্রতিক্রিয়ায় শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি (AFP) জানিয়েছে, তেহরানের আকাশে অন্তত ১০টি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের আকাশসীমায় ইরান থেকে আসা বেশ কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে।এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ইউরোপীয় ন্যাটো (NATO) দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের সরাসরি সহায়তা না দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার মিয়ামিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "ন্যাটোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি তারা আমাদের প্রয়োজনে পাশে না থাকে, তবে আমরাও তাদের সুরক্ষায় দায়বদ্ধ থাকব না।"ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং তারা একটি চুক্তিতে আসতে চাইছে। সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবে তেহরান ১০টি তেলের জাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তেহরান সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সরাসরি কোনো বৈঠক হয়নি; কেবল পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার ডনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে যে ফোনালাপ হয়, তাতে যুক্ত ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। হোয়াইট হাউস এই আলাপকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মাস্কের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।সংঘাতের আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি লোহিত সাগর ব্যবহার করে কোনো দেশ ইরান বা অন্য কোনো মুসলিম দেশে হামলা চালায়, তবে তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে কঠোর নজরদারি ও শত্রু জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছে