
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার উত্তাপ এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল বাংলাদেশের আকাশে। মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে দেশে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি অস্বাভাবিকভাবে ১০৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। জ্বালানির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশীয় এভিয়েশন খাত। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাবে অভ্যন্তরীণ প্রতিটি রুটে বিমান ভাড়া কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও বিপিসির তথ্যমতে, চলতি মাসের শুরুতে প্রথম দফায় লিটারপ্রতি ১৭ টাকা এবং মাসের শেষ দিকে এসে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৯০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশেই জেট ফুয়েলের দাম সর্বোচ্চ।জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ উল্লেখ করে বলেন:“একটি এয়ারলাইন্সের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশই যায় জ্বালানিতে। যদি ১৬ দিনে লিটারে ১০৭ টাকা বাড়ে, তবে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প থাকে না। এতে যাত্রী সংকট তৈরি হবে এবং পুরো এভিয়েশন খাতের সঙ্গে যুক্ত পর্যটন ও হোটেল ইন্ডাস্ট্রিও ধসে পড়বে।”এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি) এই মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক এবং একপাক্ষিক বলে দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, অন্যান্য তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলেও কেবল জেট ফুয়েলের ওপর এই বাড়তি চাপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপাল জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ। পাকিস্তানে ২৪.৫% এবং মালদ্বীপে ১৮.৫৪% দাম বাড়লেও বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ৩৬ হাজার ৬৬১ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত ছিল, যা দিয়ে বড়জোর ২৪ দিন ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ভর্তুকি বা বিশেষ ছাড় না আসলে অচিরেই অনেক অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিমান ভাড়া হঠাৎ দেড়-দুই হাজার টাকা বেড়ে গেলে সাধারণ যাত্রীরা আকাশপথ বিমুখ হবেন। এতে আসন্ন ঈদুল ফিতর ও গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রামের পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে।সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের উদীয়মান এভিয়েশন শিল্পটি দীর্ঘমেয়াদী লোকসানের মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।