নিজের টাকায় গড়ে তুললেন ‘অক্সিজেন গলি’ — যশোরে ব্যবসায়ী এরশাদের সবুজ উদ্যোগে বদলে গেল ৩০০ মিটার সড়ক

যশোর শহরের একটি ধুলোমাখা ও কর্মচাঞ্চল্যে ভরা সড়ক এখন পরিণত হয়েছে সবুজে ঘেরা মনোরম পথে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ৩০০ মিটার সড়কের দুই ধারে ফুল ও পাতাবাহার গাছ লাগিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য সবুজ পরিবেশ। স্থানীয়রা ভালোবেসে এই সড়কের নাম দিয়েছেন ‘অক্সিজেন গলি’।যশোর শহরের মণিহার প্রেক্ষাগৃহ সংলগ্ন ঢাকা সড়কের পাশে বারান্দিপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই গলি। প্রায় দেড় বছর ধরে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সড়কের দুই ধারে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহার গাছ লাগিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা করে যাচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. এরশাদ।সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের দুই পাশে রয়েছে হালকা প্রকৌশলশিল্প, গাড়ির পুরোনো যন্ত্রাংশ তৈরি ও টায়ার মেরামতের অন্তত ১২টি ওয়ার্কশপ এবং কয়েকটি বসতবাড়ি। এসব দোকান ও বাড়ির দেয়ালজুড়ে এখন সবুজ লতাপাতার ছোঁয়া। সিঙ্গোনিয়াম (অ্যারোহেড প্ল্যান্ট), ইঞ্চি প্ল্যান্ট (জেব্রিনা), নীল অপরাজিতাসহ নানা ধরনের লতাজাতীয় গাছ দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ও গাড়ির মবিলের বোতল কেটে তৈরি করা টবে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন ইনডোর প্ল্যান্ট ও ক্যাকটাস, যা দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।ব্যবসায়ী মো. এরশাদ জানান, সড়কের পাশে তাঁর বাবার মোহাম্মদ আলী ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামে একটি লেদ কারখানা রয়েছে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় তিনি সেখানে থাকেন। আগে এই এলাকার পরিবেশ ছিল ধুলাবালিতে ভরা ও নির্জীব। সেই পরিবেশ বদলাতেই প্রায় দেড় বছর আগে মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে সিঙ্গোনিয়াম গাছ এনে রোপণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য দোকান ও বাড়ির সামনেও গাছ লাগাতে শুরু করেন।তিনি বলেন, “যখনই কোনো ফেলে দেওয়া বোতল পাই, তখনই সেটি কেটে ফুলের টব বানাই। তাতে গাছ লাগিয়ে সড়কের পাশে ঝুলিয়ে দিই। এতে পরিবেশ সুন্দর হয়, মানুষও আনন্দ পায়।”স্থানীয় ব্যবসায়ী বাসিন্দারা বলেন, “এরশাদ ভাইকে প্রায়ই গাছের পরিচর্যা করতে দেখি। কাজের ফাঁকে একটু সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মনটা ভালো হয়ে যায়।”আরেক ব্যবসায়ী বলেন, “কয়েক দিন আগে ভোরে হাঁটতে গিয়ে দেখি এরশাদ ভাই নিজে গাছের পরিচর্যা করছেন। বিষয়টি দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমিও আমার কারখানার আশপাশে এমন সবুজায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছি।”যশোর শহরের বকচর এলাকার বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী এরশাদ উচ্চমাধ্যমিক পাস করে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় বর্ষের পর আর পড়াশোনা শেষ করা হয়নি। বর্তমানে বাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে লোহা, পিতল, তামা ও স্টিলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করছেন। তাঁদের কারখানায় প্রায় ১২ জন কর্মী কাজ করেন এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে যন্ত্রাংশ তৈরি করতে আসেন।
এরশাদ জানান, নড়াইল, মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনেক মানুষ তাঁর এই উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি অন্তত ১০ জনকে বিনা মূল্যে গাছের চারা দিয়েছেন।গাছ লাগানোর পথে কিছু বাধাও এসেছে। সম্প্রতি সড়ক থেকে কয়েকটি ফুলের টব চুরি হয়ে যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে হতাশ নন এরশাদ। তিনি বলেন, “কেউ যদি টব চুরি করে নিজের বাড়ি বা দোকানে রাখে, তাতেও তো পরিবেশ সবুজ হবে। এতে আমার আপত্তি নেই।”নিজের আনন্দ থেকেই এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। স্থানীয়দের মতে, এই সবুজায়নের কারণে সড়কটি এখন অনেক বেশি মনোরম ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। অনেকেই কাজের ফাঁকে এখানে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চোখের প্রশান্তি নেন এবং বুক ভরে নিশ্বাস নেন।এরশাদ বলেন, “মানুষ যেন একটু স্বস্তি পায়—এই চিন্তা থেকেই কাজটি করছি। সামনে পাশের আরেকটি সড়কেও এমন সবুজায়ন করার পরিকল্পনা আছে।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031