
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত টাঙ্গন নদী স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীতীরবর্তী ভূমি এবং আশপাশের পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দৌলতপুর ইউনিয়নের সাগুনী শালবন এলাকায় এই অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা স্থানীয় পরিবেশ ও বনাঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে কিংবা ভোরের দিকে নদী থেকে ট্রাক ও ট্রলির মাধ্যমে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশ দ্রুত গভীর হয়ে যাচ্ছে এবং তীরবর্তী ভূমি ভাঙনের আশঙ্কা বাড়ছে। নদীর তীরের কাছাকাছি অবস্থিত সাগুনী শালবনও এই পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ সচেতনরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু উত্তোলন করলে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীর তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে পানির প্রবাহের ধরণ পরিবর্তিত হয় এবং তীরবর্তী ভূমি ধসে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর ফলে নদীর আশপাশের কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও বনাঞ্চল ক্ষতির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশে নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, সরকারের নির্ধারিত স্থান ও অনুমতি ছাড়া কোথাও থেকে বালু উত্তোলন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, যার মধ্যে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।এছাড়াও পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৬(ক) অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি সাধনকারী কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করে বালু উত্তোলন করলে এই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নদীর তীরবর্তী বনাঞ্চল যেমন সাগুনী শালবনের ওপর এই ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ নদীর তীর ক্ষয় হতে শুরু করলে বনভূমির মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নদী থেকে বালু তোলার কারণে নদীর তীর আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে নদীর তীরবর্তী কৃষিজমি ও বনাঞ্চল বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।পরিবেশবিদদের মতে, নদী শুধু পানির উৎস নয়, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। তাই নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরিটাঙ্গননদী ও সাগুনী শালবনের পরিবেশ সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।পীরগঞ্জের মানুষের প্রত্যাশা—টাঙ্গন নদী যেন তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকতে পারে। এজন্য অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।