কল রেকর্ড ফাঁসেই আলোচনায় রহিম মাস্টার, আলমডাঙ্গায় শুরু তীব্র বিতর্ক

পর্ব–৪: কল রেকর্ড ফাঁস—‘শেখ হাসিনার জন্য সবকিছু করতে পারি’ দাবি রহিম মাস্টারের; রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে চাকরির নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:


চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়া সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুর রহিম ওরফে ‘রহিম মাস্টার’-কে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একাধিক কল রেকর্ডে তার রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বিস্তার এবং চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ধারাবাহিক পর্বের আজ চতুর্থ পর্ব উঠে এসেছে রহিম মাস্টারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, কল রেকর্ডে উঠে আসা বক্তব্য এবং অভিযোগ ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন মহলে চাপ প্রয়োগের বিষয়।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একটি কল রেকর্ডে রহিম মাস্টারকে বলতে শোনা যায়, “আমি শেখ হাসিনার জন্য সবকিছু করতে পারি, আমি শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি।” সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সম্পর্ক তুলে ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রহিম মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং প্রজন্মলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে তিনি এলাকায় একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আলমডাঙ্গা উপজেলার হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়া সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া আস্তানগর গ্রামের প্রীতি সিনহা নামে এক তরুণীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে রহিম মাস্টারের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ভুক্তভোগী প্রীতি সিনহার অভিযোগ, রহিম মাস্টার তাকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করেন। পরে তিন লক্ষ টাকা গ্রহণ করে চাকরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও চাকরি না দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাকে আবাসিক হোটেলে নিয়ে গিয়ে প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে রহিম মাস্টার চাকরি দেওয়া ও প্রেমের সম্পর্ক—দুই বিষয় থেকেই সরে দাঁড়ান।
পরে বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে রহিম মাস্টারের নাম আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে তিনি বিভিন্ন মহলে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন এবং সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
এছাড়া নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে রহিম মাস্টার সংবাদ সম্মেলন করেন এবং অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও মানহানিকর বলে দাবি করেন। এ সময় তিনি ভুক্তভোগী এবং সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সরকারের পতনের পর রহিম মাস্টার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী প্রীতি সিনহার দাবি, “আমার কাছ থেকে নেওয়া তিন লক্ষ টাকা আমাকে ফেরত দিতে হবে। অন্যথায় আমি আইনি ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।”


তিনি ইতোমধ্যে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের কাছে রহিম মাস্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। একই সঙ্গে সাংবাদিক মহলের পক্ষ থেকেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া, অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ বন্ধের চেষ্টা এবং ভুক্তভোগী ও সাংবাদিকদের হয়রানির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে চাকরি দেওয়ার কথা, অর্থ লেনদেন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কথোপকথনের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে রহিম মাস্টার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আলমডাঙ্গায় এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুর রহিম ওরফে ‘রহিম মাস্টার’-কে ঘিরে বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
(চলবে)

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031