
পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে গোপন কক্ষে ভোটারদের স্মার্টফোন নিয়ে প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি গোপন ভোটাধিকারকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হয়, তবে ভোটের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার সেই গোপনীয়তার জন্য স্পষ্ট হুমকি।আইনি কাঠামো কী বলে?বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য। এ প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি), যা সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত।গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (Representation of the People Order - RPO) অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ চলাকালে শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। RPO-এর ধারা ৩১ ও ৩২ অনুযায়ী, ভোটকক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, প্রভাব বিস্তার বা ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করার মতো কোনো কার্যকলাপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি কোনো ভোটার গোপন কক্ষে স্মার্টফোন নিয়ে প্রবেশ করে ভোটের ছবি তোলে বা অন্যকে প্রদর্শন করে, তবে তা গোপন ভোট নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।এছাড়া নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো প্রকার ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ বিশেষত এমন ডিভাইস যা ভোটের গোপনীয়তা ভঙ্গ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন প্রায় প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ভোটকক্ষে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।সম্ভাব্য দায় কার?ভোটকেন্দ্রের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব তাঁদের। ভোটাররা যদি গোপন কক্ষে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করে, তবে তা নজরদারির ঘাটতি নির্দেশ করে। আইন প্রয়োগে অবহেলা প্রশাসনিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।কেন্দ্রে প্রবেশের সময় তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ তাঁদের দায়িত্বের অংশ। মোবাইল ফোন বহনে বাধা না দিলে তা দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।যদি পূর্বপ্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ বা তদারকিতে ঘাটতি থাকে, তবে দায় প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও বর্তাতে পারে।ঝুঁকি কোথায়?স্মার্টফোন দিয়ে ব্যালট পেপারের ছবি তুলে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ভোট কেনাবেচা বা প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে দেয়। এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়; গণতান্ত্রিক নীতির অবমাননা। ভোটার যদি প্রমাণ দেখাতে বাধ্য হয়, তবে গোপন ভোটের ধারণাই ভেঙে পড়ে।কী হওয়া উচিত?প্রথমত, নির্বাচন কমিশনকে তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে RPO অনুযায়ী বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি, মোবাইল জমা রাখার ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে। পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা স্থানীয় একটি অনিয়ম নয় বরং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার জন্য সতর্কবার্তা। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো ভোটের গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনে সামান্য শৈথিল্যও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।