
নির্বাচন কেবল ভোট দেওয়ার দিন নয় নির্বাচন মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া। এই বোধটুকু যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলে, তখন সেটি আর নিছক রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকে না—রূপ নেয় নাগরিক শিক্ষার আন্দোলনে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর জাবরহাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘গণভোট ২০২৬’ বিষয়ক মতবিনিময় সভাটি ঠিক সেই রকমই একটি উদ্যোগ, যেখানে পুরো আয়োজনের বুদ্ধিবৃত্তিক চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএফপিও ডা. কামাল আহমেদ।এই সভায় ডা. কামাল আহমেদ কেবল একজন আয়োজক বা বক্তা ছিলেন না তিনি ছিলেন পুরো সংস্কার ভাবনার ব্যাখ্যাকারী ও অনুবাদক। জটিল সাংবিধানিক প্রস্তাব, সংসদীয় কাঠামোর পরিবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার রূপরেখা সবকিছুই তিনি ভেঙে বলছিলেন সাধারণ মানুষের ভাষায়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটাই: “এটা কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়, এটা রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়ার প্রক্রিয়া।”সভায় বিতরণ করা লিফলেটের প্রতিটি অংশ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করেন তিনি। শুরু করেন মূল প্রশ্নটি দিয়ে—জুলাই জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণ সম্মত কি না। এরপর চারটি স্তম্ভের কথা বলেন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, দ্বিকক্ষ সংসদ ব্যবস্থা, ৩০ দফা কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা।ডা. কামাল আহমেদের ব্যাখ্যায় প্রথম স্তম্ভটি হয়ে ওঠে “নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থা ফেরানোর ভিত্তি”। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো যদি সত্যিই স্বাধীন ও শক্তিশালী না হয়, তাহলে কোনো নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষক ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাৎক্ষণিক সাড়া দেখা যায়।দ্বিকক্ষ সংসদ নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাবে তিনি অত্যন্ত বাস্তববাদী ভঙ্গিতে বলেন, “এটা ক্ষমতা বাড়ানোর নয়, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো।” সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করেন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ভারসাম্য তৈরির সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে।তৃতীয় স্তম্ভ—৩০ দফা সংস্কার—এই অংশটিকে তিনি বলেন “রাষ্ট্রের ভেতরের ইঞ্জিন মেরামতের রূপরেখা”। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব—এসব বিষয়কে তিনি আলাদা আলাদা করে ব্যাখ্যা করেন এবং জোর দেন একটি কথায়: এগুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এগুলো হবে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তাঁর বলা একটি লাইন: “এই গণভোটের মাধ্যমে মানুষ শুধু সরকার বেছে নেবে না, সরকার কীভাবে চলবে সেটাও ঠিক করে দেবে।”সভায় উপস্থিত কৃষক, জনপ্রতিনিধি, নারী ভোটার ও তরুণদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ডা. কামাল আহমেদ বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট করেন—এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, জনমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের নৈতিক বৈধতা তৈরি করা।জাবরহাটের এই সভা প্রমাণ করে দিয়েছে সংস্কার ভাবনা যদি মানুষের ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে জনগণ শুধু দর্শক থাকে না, অংশীদার হয়ে ওঠে। আর সেই সেতুবন্ধনের কাজটি এই অঞ্চলে যিনি সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে করছেন, তিনি নিঃসন্দেহে ডা. কামাল আহমেদ।এই সভা থেকে একটি বার্তাই পরিষ্কার: মানুষ আর শুধু ভোট দিতে চায় না ভোটের অর্থও বুঝতে চায়। আর সেই বোঝাপড়ার পথটাই খুলে দিচ্ছেন ডা. কামাল আহমেদের মতো মানুষরা।