
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বাঁশগাড়া এলাকায় ৯০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত সংরক্ষিত সাগুনী শালবনটি একসময় ছিল এলাকার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের নীরব রক্ষাকবচ। কিন্তু আজ সেই বন যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি খোলা আকাশের বিজ্ঞাপন বোর্ডে। গাছে গাছে পেরেক মেরে, দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি, কোচিং সেন্টার, ক্লিনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের রঙিন পোস্টার ও ব্যানার। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, শালগাছ নয়—একেকটা দাঁড়িয়ে থাকা বিলবোর্ড বনের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এই নগ্ন বাণিজ্যিক দখলদারির চিত্র। শাল, সেগুন ও অন্যান্য দেশি প্রজাতির গাছের কাণ্ডে পেরেক ঠুকে সাঁটানো হয়েছে বিজ্ঞাপন। কোথাও কোথাও এমনভাবে পোস্টার লাগানো হয়েছে যে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, পেরেক ও তারের আঘাতে অনেক গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রোগ ধরার ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ এই বনটি সরকারি ভাবে সংরক্ষিত—এর প্রতিটি গাছই রাষ্ট্রীয় সম্পদ।বাঁশগাড়া এলাকার বাসিন্দা রমেশ চন্দ্র (৫৫) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই বন দেখে আসছি। আগে এখানে ঢুকলে শান্তি লাগত। এখন মনে হয় কোনো বাজারের দেয়ালে ঢুকেছি—চারদিকে বিজ্ঞাপন আর পোস্টার।” আরেক বাসিন্দা বাসন্তি রাণী (৪০) জানান, “গাছের গায়ে পেরেক মারা মানে গাছকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলা। কিন্তু কেউ দেখেও না দেখার ভান করে।” তৃতীয় বাসিন্দা কলেজশিক্ষার্থী কমল চন্দ্র বলেন, “এটা শুধু সৌন্দর্য নষ্টের বিষয় না, এটা আইন ভাঙার স্পষ্ট উদাহরণ। সংরক্ষিত বনে এভাবে কিছু করা যায়?”বিষয়টি নিয়ে কথা হলে বাঁশগাড়া বিট কর্মকর্তা শাহাজান আলী স্বীকার করেন, সংরক্ষিত বনের গাছে বিজ্ঞাপন সাঁটানো সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি বলেন, “বন আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে কোনো গাছের ক্ষতি করা, পেরেক মারা, পোস্টার লাগানো বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা মাঝে মাঝে এগুলো খুলে দেই, কিন্তু আবার লাগানো হয়।” তাঁর বক্তব্যেই ফুটে ওঠে প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র—“মাঝে মাঝে” খুলে দেওয়া যথেষ্ট নয়, দরকার নিয়মিত নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।বাংলাদেশের বন আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনের কোনো গাছের ক্ষতি সাধন, গাছের গায়ে কিছু সংযুক্ত করা বা বনের ভেতরে অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অপরাধ। এর জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ড দুটোরই বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আইন কাগজে থাকলেও প্রয়োগে রয়েছে মারাত্মক শৈথিল্য। যার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী মহল বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নির্বিঘ্নে বনের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতা নষ্ট করছে।এই বনটি শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি পীরগঞ্জ এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এখানে পাখি, ছোট প্রাণী ও নানা প্রজাতির উদ্ভিদের আবাস। গাছের গায়ে পেরেক মারা ও পোস্টার লাগানোর ফলে শুধু গাছই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। তাছাড়া, সংরক্ষিত বনের নান্দনিকতা নষ্ট হওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃতির কাছ থেকে যে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার কথা, সেটাও ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।প্রশ্ন উঠছে এই অবস্থা চলতে থাকলে সংরক্ষিত বনের “সংরক্ষণ” শব্দটির অর্থ কী থাকে? কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে, মাঠের বাস্তবতায় এই বন ধীরে ধীরে তার স্বাতন্ত্র্য হারাবে। স্থানীয়রা বলছেন, নিয়মিত টহল, দ্রুত বিজ্ঞাপন অপসারণ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না।আজ শালগাছ যখন বিলবোর্ডে রূপ নেয়, তখন তা শুধু একটি বনের সৌন্দর্যের শ্রাদ্ধ নয়—এটি আমাদের পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারেরও নীরব পরাজয়। এখনই যদি কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ না করা হয়, তবে অচিরেই এই ৯০ একরের সংরক্ষিত বনটি কেবল নামেই “সংরক্ষিত” থেকে যাবে, বাস্তবে পরিণত হবে আরেকটি অবহেলিত ও ক্ষতবিক্ষত সবুজ স্মৃতিতে।