
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গায় তিন দিনব্যাপী কৃষি প্রযুক্তি প্রদর্শন মেলা–২০২৬ শুরু হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বেলুন উড়িয়ে ও ফিতা কেটে মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। উদ্বোধন শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। পরে জেলা প্রশাসক মেলায় প্রদর্শিত ১৪টি স্টল ঘুরে দেখেন।
মেলা উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার। অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষিকে টেকসই করতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি আমাদের কাজকে সহজ করে এবং উন্নয়নের গতি বাড়ায়। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করে নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।
তিনি বলেন, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অভাব রয়েছে। তবে এই মেলায় প্রদর্শিত প্রযুক্তিগুলো থেকে কৃষকরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, যা তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে সহায়ক হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, অধিকাংশ কৃষক শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই নজর দেন। কিন্তু উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে ফলন ভালো হলেও জমির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এখন থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করা যাবে না।
তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে তা খাল-বিল ও জলাশয়ে গিয়ে মাছ ও উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস করছে। ফসল রক্ষার নামে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় দমন করতে হবে।
পানি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। খাল, বিল ও পুকুর থাকা সত্ত্বেও ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এই পানির স্তর পুনরুদ্ধারে অন্তত ৩০ বছর সময় লাগে। তাই আশপাশের খাল-বিল ও পুকুরের পানি ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, এই মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রদর্শিত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিগুলো যেন কৃষকরা ভালোভাবে জানতে ও আয়ত্ত করতে পারেন। মেলায় পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি স্টলে প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করছেন।
তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারী কৃষকরা এসব প্রযুক্তি শিখে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে অন্য কৃষকদের মাঝেও তা ছড়িয়ে দেবেন। মেলায় সরাসরি তেল উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রদর্শনের জন্য একটি তেল মাড়াই যন্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অনেক ভোজ্যতেল প্রকৃত অর্থে মানসম্মত নয়। একসময় আমাদের দেশের ঐতিহ্য ছিল সরিষার তেল। সরিষার উৎপাদন বাড়িয়ে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান ও কৃষি) দেবাশীষ কুমার দাস, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মিঠু চন্দ্র অধিকারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলায় উন্নত জাতের ফসল, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রসহ মোট ১৪টি স্টল স্থাপন করা হয়েছে। মেলায় কৃষক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।