ঠাকুরগাঁও-৩ আসন—পীরগঞ্জ ও রানীশংকৈল উপজেলা নিয়ে গঠিত শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে প্রান্তিকতার এক নীরব মানচিত্র। সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর বসবাস এই জনপদকে দিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। কিন্তু এই বৈচিত্র্য রাষ্ট্রের চোখে কতটা নাগরিক আর কতটা শুধু পরিসংখ্যান সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট। নির্বাচন এলেই এই জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কথা শোনা যায়, তাদের নাম উচ্চারিত হয়, তাদের কষ্ট নিয়ে বক্তব্য আসে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে তারা আবার ফিরে যায় নীরবতার অন্ধকারে। যেন তারা রাষ্ট্রের নাগরিক নন,রাষ্ট্রের কেবল একটি মৌসুমি প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈধতা আসে “অন্তর্ভুক্তি” থেকে সব নাগরিককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর অংশ করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের সংবিধানও সেই কথাই বলে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও-৩ এর নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে মনে হয়, তারা এখনো রাষ্ট্রের কেন্দ্র নয়,তারা রয়ে গেছে প্রান্তে। এখানে রাজনীতি চলে এক ধরনের প্রতীকী স্বীকৃতি দিয়ে। নির্বাচনী ভাষণে নৃগোষ্ঠীর নাম থাকে, কিন্তু নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের উপস্থিতি থাকে না। এটি এমন এক রাজনীতি, যেখানে পরিচয় ব্যবহৃত হয়, কিন্তু অংশীদারিত্ব দেওয়া হয় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যাকে বলেছিলেন,’অদৃশ্য নাগরিকত্ব’। ঠিক সেটাই যেন ঘটছে এখানে। প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি তাই কেবল নির্বাচন জয়ের অঙ্ক নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির প্রশ্ন। গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়; গণতন্ত্র মানে সিদ্ধান্ত তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ। কিন্তু বাস্তবে নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠী সেই প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। তারা ভোট দেয়, কিন্তু নীতি নির্ধারিত হয় তাদের ছাড়া। এই বাদ পড়ার সবচেয়ে করুণ দিকটি দেখা যায় ভূমি, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার প্রশ্নে। ভূমি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত, ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। অথচ এই ভূমিই সবচেয়ে অনিরাপদ। নির্বাচনের সময় এই ইস্যু আলোচনায় আসে, কিন্তু নির্বাচনের পর আবার প্রশাসনিক ফাইলের ভেতর হারিয়ে যায়। রাষ্ট্র যেন এখানে একজন নিরপেক্ষ রক্ষক নয়, বরং একজন দূরবর্তী দর্শক।রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কাঠামোগত অন্তর্ভুক্তি যেখানে কাঠামোগতভাবে কাউকে বাইরে রেখে দেওয়া। এর ফলে একসময় সেই জনগোষ্ঠী শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা ভোটার থাকে, কিন্তু নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না।এখানেই প্রশ্ন ওঠে—এটা কি কেবল অবহেলা, নাকি এটি একটি দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংস্কৃতি? যে সংস্কৃতিতে উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তা-ঘাট বা ভবন, কিন্তু উন্নয়ন মানে মানুষের মর্যাদা নয়। যে সংস্কৃতিতে নাগরিকত্বের মাপকাঠি হয়ে ওঠে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সংবেদনশীলতা নয়।নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি, সংবিধানের সমতার নীতি, সবকিছু কাগজে-কলমে আছে। কিন্তু রাষ্ট্র তো কেবল কাগজে চলে না, রাষ্ট্র চলে রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। আর সেই সদিচ্ছার অভাবটাই এখানে সবচেয়ে প্রকট।২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আবারও শোনা গেছে—নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতা বলছে, এই কথাগুলো ছিল অনেকটাই মৌসুমি। সরকার বদলায়, শ্লোগান বদলায়, কিন্তু নৃগোষ্ঠীদের অবস্থান বদলায় না।
ফরাসি দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, রাষ্ট্রের বৈধতা আসে ‘সাধারণ ইচ্ছা’ থেকে। প্রশ্ন হলো,নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা কি কখনো সেই ‘সাধারণ ইচ্ছা’র অংশ হয়? নাকি তারা কেবল পরিসংখ্যানে ব্যবহৃত একটি নীরব সংখ্যা?ঠাকুরগাঁও-৩ এর উন্নয়ন নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়—এটি কেবল নৈতিক কথা নয়, এটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র যদি তার প্রান্তিক নাগরিকদের বারবার উপেক্ষা করে, তবে একসময় সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক দাবি নিজেই ফাঁপা হয়ে যায়।আজ প্রশ্নটা আর কে কত প্রতিশ্রুতি দিল, সেটি নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর—নৃগোষ্ঠী কি কেবল ভোটারই থাকবে, নাকি তারা সত্যিকারের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার হবে?সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু নৃগোষ্ঠীদের ভাগ্য কি কখনো বদলাবে? তারা কি চিরকালই “সব ক্ষেত্রে উপেক্ষিত” হয়েই থাকবে, নাকি একদিন এই রাষ্ট্র সত্যিই তাদেরও রাষ্ট্র হয়ে উঠবে?এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে—ঠাকুরগাঁও-৩ এ গণতন্ত্র আসলে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, নাকি শুধু একটি নিয়মিত অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিকতা।










