
দেশজুড়ে দান, খয়রাত ও জাকাতের টাকায় পরিচালিত কওমী মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর বেতনের বাড়তি চাপ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করছেন, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও গরীব-অসহায় শিক্ষার্থীদের আলেম-আলেমা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বেতন ও ফি ধার্য করায় দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের ভাষ্য, ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, বোর্ডিং খরচ, পরীক্ষার ফি, উন্নয়ন ফি—নানা অজুহাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে যেসব পরিবার আলেম শিক্ষার মাধ্যমে সন্তানদের ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন দেখতেন, তারাই আর্থিক চাপে সেই পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। মণিরামপুরের এক অভিভাবক বলেন, “মানুষ দান করে গরীব ছাত্রদের জন্য, কিন্তু বাস্তবে গরীবরাই বেতনের জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে। মাসে মাসে টাকা না দিতে পারলে ছাত্রদের মানসিক চাপে রাখা হয়।” আরেকজন অভিভাবকের প্রশ্ন, “যদি দানের টাকায় চলা মাদ্রাসায় গরীব ছাত্রই পড়তে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ দান করে লাভ কী?” স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কওমী মাদ্রাসাগুলো ঐতিহ্যগতভাবে সমাজের অনুদাননির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। সেখানে দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার অভাব এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বেতনের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে দানের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের দাবি, দান ও জাকাতভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক নীতিমালা ও ব্যয়ের খাত প্রকাশ্যে আনতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা তহবিল গঠন, বেতন মওকুফের নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ ধনী-নির্ভর হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের একাংশ বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষক ও অবকাঠামো ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই বেতন বাড়াতে হচ্ছে। তবে তারা স্বীকার করেন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা কাঠামো প্রয়োজন। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ধর্মপ্রাণ দাতাদের মাঝেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যে মাদ্রাসা গরীবদের জন্য, সেখানে যদি বেতনের কারণে গরীব শিক্ষার্থীরাই আলেম হতে না পারে, তবে দানের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে?