
পীরগঞ্জ উপজেলার পৌরশহরের আনাচে–কানাচে এবং প্রধান সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী বট, অশ্বত্থসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ আজ নীরব আর্তনাদ করছে। কারণ, এসব গাছের গায়ে নির্বিচারে পেরেক মেরে সাঁটানো হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট চেম্বার, কোচিং সেন্টার ও নানা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন। মানুষের চোখে এগুলো হয়তো সস্তা প্রচারের মাধ্যম, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি পরিবেশ ও আইনের উপর সরাসরি আঘাত। প্রাকৃতিকভাবে একটি গাছ শুধু ছায়া বা অক্সিজেনই দেয় না; এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে পোস্টার লাগালে ছালের ভেতরের জীবন্ত কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে রোগ সংক্রমণ বাড়ে, গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একসময় মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। অর্থাৎ, একটি বিজ্ঞাপনের আয়ু কয়েক দিন হলেও ক্ষতির প্রভাব বছরের পর বছর। আইনের দৃষ্টিতেও এই কাজ স্পষ্টতই অপরাধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি সাধনকারী যে কোনো কার্যকলাপ দণ্ডনীয় অপরাধ। গাছের গায়ে পেরেক মারা ও ক্ষত সৃষ্টি করা পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতির শামিল। একইভাবে বন আইন, ১৯২৭-এ অনুমতি ছাড়া কোনো গাছের ক্ষতি করা, কাটা বা আঘাত করা আইনত নিষিদ্ধ। এমনকি গাছ উপড়ে ফেলা না হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষত সৃষ্টি করাও এই আইনের আওতায় পড়ে। এছাড়া বাংলাদেশ দণ্ডবিধি (পেনাল কোড), ১৮৬০-এর ধারা ৪২৭ অনুযায়ী, যদি কেউ ৫০ টাকার বেশি ক্ষতি সাধন করে সম্পদের ক্ষতিসাধন করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের পরিবেশগত ও আর্থিক মূল্য এই সীমার বহু গুণ বেশি এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। পৌর এলাকায় হলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা আইন ও স্থানীয় বিধিমালাও জনসম্পদ নষ্ট করার দায়ে জরিমানা আরোপের সুযোগ দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই অবৈধ কাজগুলো দিনের আলোতেই হচ্ছে, অথচ কার্যকর নজরদারি নেই। পৌর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা একে পরোক্ষ প্রশ্রয় দিচ্ছে। আইন থাকলেও প্রয়োগ না হলে তা কেবল কাগজে বন্দি থাকে। গাছ কোনো বিলবোর্ড নয়, কোনো নোটিশ বোর্ডও নয়। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামী প্রজন্ম পাবে কংক্রিটের শহর, কিন্তু ছায়ার জন্য একটি গাছও খুঁজে পাবে না। এখনই সময় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই অন্যায় বন্ধ করা, দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনসচেতনতা তৈরি করা। না হলে পেরেকের আঘাতে শুধু গাছই নয়, ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ।