বাংলাদেশের রেলপথ ইতিহাসের সূচনালগ্নে যে অধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল, তার অন্যতম প্রতীক আজ ধ্বংসের শঙ্কায় দাঁড়িয়ে আছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন—যেখানে দেশের প্রথম রেলপথের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত চালু হয় ব্রডগেজ রেললাইন। আর সেই ঐতিহাসিক পথের অংশ হিসেবেই আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন নির্মিত হয়। ইতিহাসের সেই দিন থেকে এ স্টেশনকে বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন শুধু একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, বরং স্থাপত্যশৈলী, সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সজীব সাক্ষ্য। দোতলা এই ভবনটি এশিয়া মহাদেশের অন্যতম উঁচু রেলস্টেশন ভবন হিসেবে পরিচিত। এর নান্দনিক নকশা, আভিজাত্যপূর্ণ কাঠামো এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলী আজও পথচারীর চোখে ধরা দেয়। তবে ইতিহাসের আরেকটি দিক হলো—এই ভবনটি একসময় ব্রিটিশ নীলকরদের নীলকুঠি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। নীল বিদ্রোহের সময়ে যে অত্যাচার, কষ্ট ও সংগ্রামের গল্প রচিত হয়েছিল, সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষীও এ ভবন। ১৬৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন বাংলাদেশের রেলপথের সূচনালগ্নের চিহ্ন বহন করছে, আর প্রমাণ করছে—কোনো স্থাপনা কেবল ইট-পাথরের নয়, এটি একটি জাতির স্মৃতি ও আবেগের প্রতীক। কালের বিবর্তনে যতই রেল যোগাযোগ বিস্তৃত হয়েছে, ততই অবহেলায় জীর্ণ হয়ে পড়েছে আলমডাঙ্গার এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশন। দেয়ালে ফাটল, ভেঙে পড়া ছাদ, মলিন হয়ে যাওয়া শৈল্পিক নকশা—সব মিলিয়ে আজ এটি কঙ্কালসার ভবনে পরিণত হয়েছে। আলমডাঙ্গা বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, “সংস্কার চাই, তবে ঐতিহ্য ভেঙে নয়।” তারা চেয়েছিলেন, ইতিহাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক রেলসুবিধা যোগ করা হোক। অবশেষে সংস্কারের কাজ শুরু হলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ—যা হচ্ছে তা প্রকৃত অর্থে সংরক্ষণ নয়, বরং ভাঙচুর। আগে যাত্রীদের বসার জন্য যে টিনশেড ছিল তার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ ফুট। সেটি ভেঙে নতুন টিনশেড বানানো হচ্ছে, যার বরাদ্দ এখন ৭৫ ফুট। মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াচ্ছে ১৭৫ ফুট। কিন্তু মানুষ বলছে—এই উন্নয়ন অর্ধেক মনোভাবের, যা যাত্রীসেবাকে এছাড়া নতুন নির্মাণে তিনটি অতিরিক্ত পিলার বসানো হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ভিত্তি বসানোর সময় ভুলবশত পুরনো একতলা ছাদের অংশ ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ—এই ভুলের কারণে ঐতিহাসিক দোতলা ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আলমডাঙ্গার সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন— “আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন শুধু একটা ভবন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস। এখানে থেকেই রেলপথের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদি এই ঐতিহ্য ধ্বংস হয়, তবে আমাদের পরের প্রজন্ম জানবেই না আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলাম।”তাদের দাবি, মূল কাঠামো সংরক্ষণ করে, অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দিয়ে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সংস্কার কাজ করা উচিত ছিল। তাহলে একদিকে ঐতিহ্য রক্ষা পেত, অন্যদিকে যাত্রীসেবাও উন্নত হতো। ১৮৬২ থেকে ২০২৫—১৬৩ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রা আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনকে পরিণত করেছে ইতিহাসের প্রতীকে। নীলকুঠির করুণ কাহিনি, দেশের প্রথম রেলস্টেশনের গৌরব, স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্য—সবকিছুই একত্রে মিশে আছে এখানে। কিন্তু আধুনিকায়নের নামে যদি ভেঙে ফেলা হয় শতবর্ষী কাঠামো, তবে নতুন প্রজন্ম কেবল গল্পই শুনবে, চোখে দেখার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। উন্নয়ন জরুরি, কিন্তু উন্নয়ন কখনোই ইতিহাস ধ্বংস করে নয়। বরং উন্নয়ন হওয়া উচিত ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে—যাতে একসাথে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা টিকে থাকে। আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন আজ এক চরম সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সংস্কারের নামে ধ্বংসের অভিযোগ, মানুষের ক্ষোভ এবং ঐতিহ্য রক্ষার আকুতি—সবকিছু মিলিয়ে এ স্টেশন এখন জাতীয় আলোচনার দাবি রাখে। আলমডাঙ্গা বাসী ও ইতিহাসবিদরা একটাই দাবি জানাচ্ছেন— “আলমডাঙ্গার ১৬৩ বছরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে, আর সেই সঙ্গে যাত্রীবান্ধব আধুনিক রেলসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন হারালে আমরা হারাবো শুধু একটি ভবন নয়, হারাবো ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়ের জীবন্ত প্রমাণ।”