চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের খেজুরতলা গ্রামের যুবক জুনায়েদ হাসান প্লাবন (১৯) মৃত্যুর নাটক সাজানো হলেও তিনি জীবিত আছেন। কয়েক মাস আগে তার মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবার ও স্থানীয়রা শোকে ভেঙে পড়েছিল। অবশেষে গত ১০ আগস্ট (২০২৫) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুক লাইভে এসে প্লাবন নিজেই জানান—সবকিছু ছিল দালালচক্রের সাজানো কাহিনি। ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দালালের মাধ্যমে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় যান প্লাবন। ইতালি যাওয়ার চুক্তি হয় ১২ লাখ টাকায়, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪২ লাখ টাকা। সেখানে পৌঁছে তাকে আটকে রেখে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে একাধিকবার পরিবার থেকে টাকা আদায় করা হয়। অবশেষে গত ১৪ মে দেশে খবর আসে—প্লাবন মারা গেছেন। পরিবার শোকে ভেঙে পড়ে এবং লাশ ফেরত আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায়। কিন্তু প্লাবন ফেসবুক লাইভে জানান—“সাগরের কাছ থেকে সোহেল নামে একজন আমাকে বিক্রি করে দেয়। নির্যাতনের পর মাথায় টুপি পরিয়ে ও পাশে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে একটি ভিডিও বানিয়ে দেশে পাঠানো হয়—যেন আমি মারা গেছি। আসলে আমি তখনও জীবিত ছিলাম। ছয় দিন আগে সাগর আমাকে ফিরিয়ে নিয়েছে। এখন আমি তার কাছেই আছি এবং ইতালিতে যেতে চাই, তবে এর জন্য আরও টাকার প্রয়োজন।”এ ঘটনায় অভিযুক্ত স্থানীয় দালাল বেলগাছি সাগর জানান—আমি এ পর্যন্ত আলমডাঙ্গা থেকে ১৫০ জনের বেশি মানুষকে ইতালিতে পাঠিয়েছি। প্লাবনকেও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু টাকা দিতে না পারায় সে বিপদে পড়ে। পরে আমি ৬ লাখ টাকা খরচ করে তাকে ফিরিয়ে এনেছি। এখন ইতালিতে পাঠাতে হলে আরও ১০ লাখ টাকা লাগবে। ইতোমধ্যেই তার পরিবারের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেকেই ৫০-৭০ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি গিয়েছে।”প্লাবনের মা জানান—“ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে আমরা একটি মামলা করেছিলাম। তাতে চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন দালালচক্র মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। আমাদের আর টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই।”প্লাবনের ভাই সুজন বলেন—“প্রথমে ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে ভিডিও পাঠানো হয়। আড়াই মাস পর আমরা ভিডিও কলে তাকে জীবিত দেখি। এখন আবার ইতালি পাঠানোর নামে ১০ লাখ টাকা দাবি করছে। কিন্তু আমাদের পক্ষে আর টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।”স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খেজুরতলা গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকে একজন না একজন বিদেশে রয়েছে। অনেকেই দালালের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে গেছেন। কেউ সফল হয়েছেন, আবার কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।এক বাসিন্দা বলেন—“আমাদের গ্রামের অনেকেই সাগরের হাত ধরে ইতালি গিয়েছে। অনেকে পরিবারকে টাকা পাঠাচ্ছে, তবে কয়েকজন দালালের প্রতারণায় বিপদে পড়েছে। এত টাকা বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে দেশে ব্যবসা করলে ভালো হতো।” আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মাসুদুর রহমান পিপিএম জানান— “যেহেতু একটি মামলা চলমান রয়েছে, আমরা বিষয়টি অবগত আছি। প্লাবন জীবিত আছে। তদন্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্লাবন জীবিত প্রমাণিত হলেও, তার মৃত্যু ঘিরে সাজানো নাটক ও দালালচক্রের প্রতারণায় হতাশায় ডুবে গেছে পরিবার ও গ্রামবাসী। মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটি এখন বড় প্রশ্ন।