পীরগঞ্জ পৌরশহরে অপরিকল্পিত নগরায়ন: ভবিষ্যতের ভয়াবহ সংকট

সাকিব আহসান, প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও: আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রামীণ উর্বর ভূমি ছেড়ে অনেকে শহরের ঘিঞ্জি গলিতে ‘ভবিষ্যতের স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের আশায় পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু এই শহরমুখী জনস্রোতের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকলে তা পরিণত হয় অপরিকল্পিত নগরায়নে, যার পরিণতি ভয়াবহ।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও এই সমস্যা প্রকট। যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরজুড়ে দেখা দিয়েছে বাসস্থান সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, পয়ঃনিষ্কাশনের দুরবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং যানজট। বিশেষ করে ঠাকুগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপ‌জেলা পৌরশহরের বাস্তবতা এই সংকটকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করছে।

শান্তিবাগ এলাকার একটি উদাহরণ যথেষ্ট। এক পশলা বৃষ্টিতেই মাঠঘেরা অঞ্চলটি হাঁটুপানি জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ এবং রাস্তার সংকীর্ণতা পরিস্থিতিকে দিনদিন আরও ভয়াবহ করে তুলছে। জরুরি সেবার জন্য যেমন ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স অনেক এলাকায় পৌঁছানোই সম্ভব হয় না, কারণ নির্মাতারা রাস্তা রেখে ঘর বানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না।

শান্তিবাগ নিবাসী ডা. শাহীনূর আলম শুভ জানান,”পৌরকর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের অভাব,
যারা বাসা বাড়ি বানাচ্ছে তাদের সচেতনতার অভাব,এই দুটি ঘাটতি নগরায়নে যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে সেটিকে জটিল করে তুলছে।”

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সোরওয়ার্দী আলম বলেন,”ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা চিন্তা না করে বিক্ষিপ্তভাবে একটি নগরের সম্প্রসারণকে অপরিকল্পিত নগরায়ন বলা যায়। মফস্বল এলাকার নগরায়ন আরও বেশি ভয়ঙ্কর কারণ গ্রাম থেকে যারা শহরে বসতি গড়ে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেই। এর
ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এছাড়াও অকৃষি জমি ভরাট করে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য যথেষ্ট হুমকিস্বরুপ।”

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবঃ
এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের প্রতি গুরুত্বারোপ করা সময়ের দাবি। শহর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠতে পারে একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও টেকসই পীরগঞ্জ।

অন্যথায়, এই অপরিকল্পিত নগরায়ন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবনধারণের পথ আরও কঠিন করে তুলবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ শূন্যতাঃ
নগরায়নের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম অব্যবস্থা। প্রতিদিনই শহর ও গ্রাম মিলিয়ে গৃহস্থালি, হাসপাতাল, কৃষি ও শিল্পবর্জ্যের পাহাড় সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এর সঠিক সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তির কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

ফলে এসব বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে ফেলে রাখা হচ্ছে, যা সৃষ্টি করছে পরিবেশগত সংকট।

মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, বিষাক্ত উপাদান মিশছে ভূগর্ভস্থ পানিতে।

প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে গিয়ে প্রাণিকুলের ওপর হুমকি সৃষ্টি করছে।

খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা বা পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস, যা বায়ু দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শহুরে এলাকায় দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং দৃষ্টিকটূ বর্জ্য পাহাড় নাগরিক জীবনে নানামুখী দুর্ভোগ ডেকে আনছে।

সমাধান কী?

সমাধান হতে পারে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথে যাত্রা:

পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রায়ন (recycling)-এর ওপর জোর দেওয়া,

জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এবং

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়।

এই ধারা বজায় না থাকলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পীরগঞ্জসহ দেশের অনেক শহরই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031