কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অফিস সহকারীর সাথে যোগসাজশ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিল উত্তোলন, রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেয়ার অভিযোগ

মো: রেজাউল ইসলাম শাফি, কুলাউড়া(মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালের রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীদের খাবার সরবরাহ করার জন্য ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্স নামে এক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ইজিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্থান হওয়ার পরও তাকে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে হাসপাতালে তোলপাড় শুরু হয়। সরেজমিনে মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের দৌঁড়ঝাপ শুরু হয়। হাসপাতালের প্রধান ডা. জাকির হোসেন রোগীদের খাবারের উপকরণ পরিমাপ করেন। পরে উপকরণটি বাবুর্চিকে সমজিয়ে দেন ঠিকাদার মুক্তার আহমদ। এদিকে গত এপ্রিল মাসে হবিগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয় থেকে দুদকের একটি টিম হাসপাতাল পরিদর্শন করে খাবারে পরিমাণ কম পাওয়ার সত্যতা পেয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন।
জানা গেছে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীন বিভাগে ভর্তিরত রোগীদেরকে ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিন সরকারীভাবে ১৭৫ টাকা মূল্যের ৩ বেলা (সকালে নাস্তা, দুপুরে ও রাতে ভাত) খাবার দেয়া হয়। এছাড়াও বিশেষ দিবসে প্রতি রোগীকে ২০০ টাকায় খাবার দেয়া হয়। টেন্ডারের শর্ত অনুয়ায়ী হাসপাতালটিতে সপ্তাহে তিন দিন দুপুরে ও রাতে ১৭৫ গ্রাম করে ৩৫০ গ্রাম ভাত, মুরগীর মাংস ৭৫ গ্রাম করে ১৫০ গ্রাম দেবার কথা। কিন্তু মাংস পরিমাণ মতো দেয়া হচ্ছে না। সপ্তাহে চারদিন দুপুরে ও রাতে ৩৫০ গ্রাম ভাত, মাছ ৭৫ গ্রাম করে ১৫০ গ্রাম দেওয়ার কথা। প্রতিদিন রোগীদের সকালে দুইটি পাউরুটি, ১টি সিদ্ধ ডিম, ২টি পাকা কলা দেয়ার কথা। কিন্তু এখানে ছোট সাইজের কলা ও নি¤œমানের পাউরুটি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মাছ-মাংসসহ মোটা চালের ভাত, পচা-বাসি তরকারিসহ নিম্নমানের খাবার পরিবেশন ও পরিমাণে কম সরবরাহ করা হয়। ২৪ জুন হাসপাতালে ৩১ জন, ২৩ জুন ৩৫ জন, ২২ জুন ৩৬ জন, ২১ জুন ৩৫ জন, ২০ জুন ৩০ জন, ১৯ জুন ৩৭ জন, ১৮ জুন ৪০ জন, ১৭ জুন ৪১ জন, ১৬ জুন ৩৪ জন রোগী ভর্তি ছিল।
হাসপাতালের বাবুর্চি সাজিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীদের খাবারে সবধরণের উপকরণ কম দেয়া হয়। মাছ-মাংস একজন রোগীর প্লেটে দুুপুরে ও রাতে ১৫০ গ্রাম দেয়ার কথা কিন্তু দেয়া হয় ৩০-৪০ গ্রাম পর্যন্ত। প্রতিদিন সকালে নি¤œমানের পাউরুটি, ছোট সাইজের কলা দেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী বলেন, এখানে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্সের মুক্তার আহমদ কাগজে কলমে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব পেলেও হাসপাতালের প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক আলমাছুর রহমান তাকে সহযোগিতা করছেন। তাদের দুইজনের যোগসাজশে নি¤œমানের খাবার দিয়ে সরকারী টাকা আত্মসাৎ করে নিচ্ছেন। বেশি কিছু বলতেও পারি না যদি আলমাছ সাহেব কোনো ঝামেলা করে। তিনি হাসপাতালে শক্ত একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
ভর্তিরত রোগী উপজেলার রাউৎগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা ইউছুফ আলী (৯০) বলে, ৫দিন ধরে শ্বাসকষ্ট, পেটের ব্যথা নিয়ে ভর্তি আছি। হাসপাতালে দুইবার সামান্য ভাত, আলু ১ পিস, ছোট সাইজের মাছ-মাংস দেয়া হয়। তরকারিতে মসলার পরিমাণ খুবই কম, মাছ-মাংস পুরোপুরিভাবে রান্না করা হয়নি। আমি বৃদ্ধ লোক খাবার খেতে গেলে বমি শুরু হয়ে যায়। পৌর এলাকার জয়পাশা এলাকার বাসিন্দা আকলু মিয়া বলেন, ৪ দিন ধরে আমার স্ত্রী ছমরুন বেগম ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি। খাবারের মান খুবই নিম্নমানের। একই কথা জানালেন পৌর এলাকার বাসিন্দা শাহেদা আক্তার। তিনি বলেন, আমার ১১ মাসের মেয়ে মরিয়ম নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালের খাবার নিম্নমানের হওয়ায় বাহির থেকে খাবার এনে খাচ্ছি। যে কয়েকবার মাছ দেয়া হয়েছে তা মাছের লেজ দেয়া হচ্ছে। কারণ হিসেবে রোগী এবং অভিভাবকরা জানান, একেবারে নিম্ন মানের খাবার, পরিমানে অল্প এবং অরুচিকর হওয়ায় তারা খাদ্য নিতে নারাজ। ফলে রোগীরা নিজেদের বাড়ী, আত্মীয়-স্বজন বা বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থ বছরে মেসার্স শিউলী এন্টারপ্রাইজের আবু তালেব মুকুল ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ২৯ টাকা পথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিল উত্তোলন করেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্সের মুক্তার আহমদ ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫০ টাকার বিল উত্তোলন করেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্সের মুক্তার আহমদ ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫০ টাকার বিল উত্তোলন করেন। এক বছরের ব্যবধানে ১৩ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি তারিখের ইজিপি টেন্ডারে দুইজন ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেন। সেখানে এক বছরের জন্য সর্বনিম্ন ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৮ টাকা পথ্য সরবরাহের রেইট দেন শিউলী এন্টারপ্রাইজ। অন্যদিকে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্স ৩০ লাখ ৪১ হাজার টাকা রেইট দেন। ইজিপি টেন্ডারের নিয়মঅনুযায়ী সর্বনি¤œ রেইট দাতা শিউলী এন্টারপ্রাইজ কাজ পাওয়ার কথা থাকলেও কাগজ সঠিক নয় বলে অজুহাত দেখিয়ে হাসপাতালের আলমাছ আহমদের যোগসাজশে জুনেদ জাহিদ ট্রেডার্সকে পথ্য সরবরাহের টেন্ডার পাইয়ে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পথ্য ঠিকাদার মুক্তার আহমদ খাবারের পরিমাণ কম দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, খাবারে কিছুটা ত্রুটি থাকবে কারণ ভ্যাট-আইটি রয়েছে। ব্যবসায়ী হয়ে দেখেন কত হিসেব। খাবারে মাছ-মাংস পরিমাণ থেকে কম দেবার বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী দিচ্ছি। মসলাও পরিমাণ মতো দিচ্ছি।
হাসপাতালের প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক আলমাছুর রহমান বলেন, আমি ঠিকাদারের সাথে অংশীদার নই। যে কেউ এটা বলতে পারে কারো মুখতো বন্ধ করতে পারবোনা। সঠিকভাবে খাবার দেয়া হচ্ছে। খাবারের তদারকির দায়িত্ব টিএইচও ও আরএমও আছেন। তারা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। আমি কোন অনিয়ম করিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন বলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি ও সহকারীকে সতর্ক করে বলেছি, পথ্য ঠিকাদার যাতে খাবারের পরিমাণ কম না দিতে পারে। প্রায়শই খাবারের উপকরণ ওজন করে দিচ্ছি। গত দুইমাস থেকে আমি দেখতেছি খাবারের মান ও ওজন ঠিক আছে। সংশ্লিষ্টদের সর্তক করেছি, তারা যেন ঠিকাদার দ্বারা প্রভাবিত না হন। তিনি আরো বলেন, রোগীদের খাবারে অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। সম্প্রতি দুদকও হাসপাতালে এসে রন্ধন শালায় অনিয়মের বিষয়টি দেখতে পায়। পরে এ ব্যাপারে আমাদের মৌখিকভাবে সতর্ক করেছে।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031