পীরগঞ্জে বিষচক্রে বন্দি মানবজীবন!

সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও:

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায়
ফি- বছরের মত এবার প্রায় ১২০৯ হেক্টর জমিতে ( এক হেক্টরে জমির পরিমাণ পাঁচ বিঘা) আমের বাগান রয়েছে।
আমাগছের সংখ্যা কৃষি অফিস সূত্র অনুযায়ী প্রায় সাত লক্ষ। ফল ধরেছে ; কোথাও কম, কোথাও কিছুটা বেশি। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে এ বছর। তবুও লাভের আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন আম বাগান ব্যবসায়ীরা।
লাভ-লোকসানের কথা তো হলো,এখন আসি দীর্ঘ সময় ধরে থাকা মারাত্মক জৈব-রাসায়নিক-মানবসৃষ্ট দুর্বিপাক সংক্রান্ত আলোচনায়।
আম বাগানে সাধারণত আশ্বিন -কার্তিক মাসে পাতাঝরা রোধে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এরপর আমগাছে মুকুল আসার পূর্বে গাছের গোড়ায় সার,বিষ ও হরমোন দেওয়া হয়।
শেষ ধাপে আমের গুটি আসার পর বাগান থেকে আম তুলে আনা পর্যন্ত যে সময়টি থাকে সেসময়ে মতান্তরে পাঁচ থেকে ছয় দফায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী পুরো পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় চারশত দফায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়েছে।

কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের যে ক্ষতিগুলো হয়, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হতে পারে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কীটনাশক অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়, জলজ পরিবেশ দূষিত হয় এবং বিভিন্ন পোকামাকড় ও জলজ প্রাণীর জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

মাটি দূষণ:
কীটনাশক মাটিতে মেশার ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন এবং উপকারী অণুজীবের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। এর ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে।

পানি দূষণ:
বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে বা স্প্রে করার সময় কীটনাশক কাছাকাছি জলাশয় যেমন নদী, পুকুর, এবং হ্রদে মিশে পানি দূষিত করে। এতে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনযাত্রার উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
বায়ু দূষণ:
কীটনাশক স্প্রে করার সময় বা বাতাসের মাধ্যমে দূষিত কণা ছড়িয়ে পরে বায়ু দূষিত করে। এই দূষিত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহ ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।
জৈব বৈচিত্র্যে ব্যাঘাত:
কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারী পোকামাকড়, পাখি, এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। কিছু কীটনাশক নির্দিষ্ট প্রজাতির পোকামাকড়কে লক্ষ্য করে তৈরি করা হলেও, এটি অন্যান্য প্রাণীর উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
খাদ্য শৃঙ্খলে প্রভাব:
কীটনাশকযুক্ত গাছপালা বা জলজ উদ্ভিদ গ্রহণ করার মাধ্যমে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান অন্যান্য প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এর ফলে খাদ্য শৃঙ্খলের উপরের স্তরের প্রাণী, যেমন মানুষ, বেশি ক্ষতির শিকার হতে পারে।

বিকল্পঃ
ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি হলো ফল গাছের ফল আসার পর, ফলগুলিকে বিশেষ ধরনের ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়া, যা ফলকে পোকামাকড়, রোগ এবং অন্যান্য বাহ্যিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এই পদ্ধতিতে ফল সংগ্রহের আগ পর্যন্ত ব্যাগটি ফলের সাথে লাগানো থাকে। এটি ফলকে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও মুক্ত রাখে।

ফ্রুট ব্যাগিং এর মূল উদ্দেশ্য হল: ফলকে পোকামাকড় ও রোগ থেকে রক্ষা করা, ফলকে বাহ্যিক আঘাত থেকে বাঁচানো, ফল পরিষ্কার এবং আকর্ষণীয় রাখা, ফল উৎপাদনে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার কমানো, রপ্তানির জন্য মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন করা.

ফ্রুট ব্যাগিং সাধারণত আমের জন্য বেশি পরিচিত হলেও, পেয়ারা, কলা সহ অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফ্রুট ব্যাগিং করার জন্য সঠিক সময় এবং পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। আমের ক্ষেত্রে, সাধারণত আমের গুটি মার্বেলের আকারের হলে ব্যাগিং করা শুরু করা হয়। ব্যাগিং করার আগে ফলটিতে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করা উচিত। এরপর ফলটিকে ভালোভাবে ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ফলটি ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

ফ্রুট ব্যাগিং একটি কার্যকর এবং পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতি, যা ফল উৎপাদনকারীদের জন্য একটি লাভজনক উপায় হতে পারে।
আম বাগানের মালিক সাইদুর রহমান জানান,” ফ্রুট ব্যাগিং এর ব্যায় বেশি হওয়ায় আমরা ওই পদ্ধতি ব্যবহার করিনা”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান জানান,” আম বাগান ব্যবসায়ীরা ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিকে জটিল এবং ব্যয়বহুল মনে করেন, একারনেই হয়ত সহজলভ্য কীটনাশক প্রয়োগের দিকেই ঝুঁকে থাকেন, ইকোসিস্টেমের চেয়ে তারা লাভ-লোকসানের হিসাবকে সবচে গুরুত্ব দেন।”

Share this news as a Photo Card

সর্বশেষ খবর

পীরগঞ্জে বিষচক্রে বন্দি মানবজীবন!

26 June 2025
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
sftv-bd3
SFtvNewsBD
www.sftvbd.com