
শুভ্র মজুমদার, কালিহাতী(টাঙ্গাইল)প্রতিনিধি: ১৩ মে—একটি তারিখ, যা টাঙ্গাইলের কালিহাতীসহ ৫টি উপজেলায় মানুষের মনে চিরস্থায়ী এক দুঃখগাথা হয়ে আছে। ১৯৯৬ সালের এই দিনে মাত্র ২-৩ মিনিটের এক প্রলয়ঙ্করী টর্ণেডো বদলে দিয়েছিল পাঁচটি উপজেলার চিত্র। কালিহাতী, গোপালপুর, বাসাইল, ঘাটাইল ও সখীপুরে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল ৪০টি গ্রাম। মুহূর্তেই হারিয়ে যায় ৫২৩টি প্রাণ, আহত হন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।ঘূর্ণিঝড়ের সেই বিকেল ছিল নিঃসীম ভয়াবহতা ও হাহাকারে ভরা। ৮৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৭টি মসজিদ ও ১৪টি মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকের শরীর থেকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পরনের শেষ কাপড়টুকুও। অনেকে হারিয়ে যান চিরতরে—উদ্ধার হয় ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ কৃষিজমি, জঙ্গল কিংবা পুকুর-ডোবা থেকে। গোপালপুরের বেলুয়া গ্রাম থেকে শুরু হয়ে আলমনগর হয়ে মির্জাপুরের পশ্চিম নুডুরচর পর্যন্ত চলে যাওয়া এই টর্ণেডো গোপালপুরে প্রাণ কেড়ে নেয় ১০৪ জনের। প্রায় চার হাজার মানুষ হন আহত। ২০০ একর পাকা ধান বিনষ্ট হয়ে যায়। ১০ হাজার গৃহপালিত পশু-পাখির প্রাণহানি ঘটে। কালিহাতীর রামপুর ও কুকরাইল গ্রামেও সেই দিন আঘাত হানে টর্ণেডো। নিহত হন ১০৫ জন। একসাথে ৭৭ জনকে দাফন করা হয় গণকবরে। বাসাইলে ধানকাটা শ্রমিকরা আশ্রয় নিয়েছিলেন মিরিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে, যা ৫টা ২০ মিনিটে ধসে পড়ে—অগণিত মানুষ চাপা পড়ে প্রাণ হারান। বাতাস ভারি হয়ে ওঠে মৃতদেহ আর গবাদিপশুর দুর্গন্ধে। বাসাইল উপজেলায় ৫ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিঃশেষ হয়ে যায় ৩ হাজার ঘর, ২০টি স্কুল, ৩০০ টিউবওয়েল, হাজারো পশু ও গাছপালা। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৩৭ হলেও স্থানীয়দের মতে প্রকৃত সংখ্যা ছিল আরও বেশি। আজও কালো মেঘ জমলে কেঁপে ওঠে ওই অঞ্চলের মানুষ। সেই বিকেল আর ফিরে না আসলেও স্মৃতি আজো রক্তাক্ত। প্রতিবছর এই দিনে স্থানীয়রা মিলাদ-মাহফিল, দোয়া ও কাঙালিভোজের আয়োজন করেন প্রিয়জন হারানোর বেদনায়। তীব্র বাতাস নয়, বয়ে গিয়েছিল এক নিঃশব্দ চিৎকার, যা আজও শুনতে পায় টাঙ্গাইলবাসী—হৃদয়ের গভীরে।










