
শুভ্র মজুমদার : টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম—বল্লা। তাঁতশিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে এই নামটি অনেক বড়। শতাব্দীপ্রাচীন তাঁতশিল্প এখানকার মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জীবিকার বুননে বল্লা আজও এক পরিচিত নাম। এই গ্রামের তাঁতের শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয়—এ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। বুননের সূক্ষ্মতায় ফুটে ওঠে বাঙালির রুচি, আবেগ ও সৃষ্টিশীলতা। এখানকার তাঁতি পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের সাথে যুক্ত। তাঁরা তৈরি করেন বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ি ছাড়াও থ্রী-পিস, ওড়না, লুঙ্গি, গামছা, বিছানার চাদরসহ নানা ধরনের সুতির ও মিশ্র কাপড়—যা দেশ-বিদেশে সমাদৃত। তাঁতশিল্পী আব্দুল খালেক মন্ডল বলেন, আমরা এই পেশার সাথে প্রায় একশ বছর ধরে জড়িত। এখন আমরা আর্থিক কষ্টে আছি। যদি সরকার ও তাঁত বোর্ড আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিল্পকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বল্লা এলাকায় হাতের তাঁত ও যন্ত্রচালিত তাঁত উভয়ই চালু আছে। যারা ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান, তারা এখনও পুরনো পদ্ধতিতে, কাঠের তাঁত মেশিনে সুতার নকশা বুনে চলেছেন। অন্যদিকে, অনেকেই এখন ব্যবহার করছেন আধুনিক পাওয়ার লুম, যার মাধ্যমে উৎপাদন হচ্ছে দ্রুতগতিতে ও বেশি পরিমাণে। যন্ত্রচালিত তাঁত মেশিনে দক্ষতার সাথে বোনা হচ্ছে রঙিন কাপড়—যেখানে ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তির সংমিশ্রণ স্পষ্ট। এই শিল্পই বল্লা এলাকার হাজারো পরিবারের প্রধান জীবিকা। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়া, আধুনিক পাওয়ার লুমের প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে তাঁতিরা কঠিন সময় পার করছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। তবু আশার আলো ফুরিয়ে যায়নি। কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও উদ্যোক্তা নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছেন। ডিজিটাল মাধ্যমে বিপণন, আধুনিক নকশা ও সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থায় বল্লার তাঁতিরা একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতায় এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে। তাঁতের এই শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি জাতীয় পরিচয়, এক টুকরো বাংলাদেশ। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ভালোবাসা ও কার্যকর সহায়তা—যাতে আবারও বল্লা গ্রামের তাঁতির ঘরে আলো জ্বলে উঠে।










