রাসেদ বিল্লাহ চিশতী : এই রমজান মাসে মহান আল্লাহপাকের সমস্ত রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। বরকত মণ্ডিত এই মাসে মুসলিম সমাজে রোজা পালন ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় গর্হিত মন্দ, পাপ ও কুরআন হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা, সৎ ও পূর্নময় কাজের চর্চা করে নফসের শুদ্ধতা অর্জনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ২য় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সিয়াস সাধনায় এক নেয়ামতের
মাস পবিত্র রমজান মাস। আরবি হিজরি সনে দীর্ঘ প্রতিক্ষায় ১১ মাস পর মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুবাতাস বইতে আসে ইসলামের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে জড়িত এই মাহে-রমজান। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজান মাসের ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ পাক মুসলিম মুমিন বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন 'হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পার' (সুরা আল বাকারা-১৮৩)। অন্য মাসের তুলনায় রমজান মাসের ইবাদত বন্দেগি ও নেয়ামত সমূহ মহান আল্লাহ সত্তর শতাংশ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। এই পবিত্র মাসে রহমতের ৩৬০টি দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়ে থাকে। শয়তান ও তার ক্বাওম এই মাসে তাদের কোন শয়তানি কার্যক্রম চালাতে পারে না। তাদের গুষ্টিসহ আল্লাহপাকের বেরিয়া দ্বারা বাঁধা থাকে। আল্লাহর অন্যন্ন রহমতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত হল সিয়াম সাধনার এ মাসে পবিত্র কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হয়েছে। এই পবিত্র মাসে পবিত্র লাইলাতুলকদর যাহা হাজার রজনী অপেক্ষাও উত্তম এক রজনী প্রবর্তিত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর বাৎসরিক ধন সম্পদ অনুপাতে এই মাসেই গরিবের মাঝে যাকাত প্রদান ফরজ করা হয়েছে। *বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এই রমাজন মাসে। * হযরত ইব্রাহীম(আ:) এর সহিফা নাযিল হয়েছিল তাৎকালীন রমজানের ১ম দিবসে, *তাওরাত নাযিল হয়েছিল এই রমজানে। * আল্লাহর নবী ও রাসুল হযরত দাউদ আঃ এর উপর যাবুর ও হযরত ইসা নবীর উপর ইনজিল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল এই পবিত্র রমজান মাসে। এ মাসের নাম পবিত্র কোরআন মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে, মহান আল্লাহ এ মাসে রোজা ফরজ করেছেন আবার এ মাসেই পবিত্র কোরআনুল কারিম নাজিল করেছেন। এ মাসের ইবাদত বন্দেগির ব্যাপারে প্রিয় রাসূলে পাক (সাঃ) সাহাবাদেরকে সুসংবাদ দিতেন। রজব ও শাবান মাস জুড়ে রমজানের ইবাদত-বন্দেগির জন্য নিজেকে তৈরি করতেন, দোয়া পড়তেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে দোয়া করতে বলতেন, রমজানের রাত ও দিনে মুসলমানদের দোয়া অনবরত আল্লাহর দরবারে কবুল করা হয়, এ মাসের প্রতি রাতে ক্ষমা লাভে ফেরেশতারা মানুষকে আহ্বান করতে থাকে। রমজান মাসে ওমরাহ আদায় আল্লাহর রাসূল (সা.) সঙ্গে হজ্ব পালনের সাওয়াব পাওয়া যায়। বার মাসে নিজ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পবিত্র রমজান মাস দিয়েই শুরু করা হয়ে থাকে। তাই এই মাসকে আত্নসুদ্ধির মাসও বলা হয়ে থাকে। অন্য যেকোনো বছরে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপি মুসলিম উম্মাহ চরম আনন্দময় উল্যাসে মেতে থাকলেও গত কয়েক রমজানে ফিলিস্তিনের মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক যুদ্ধে সে আনন্দ ভাটি পড়ে। এবারের রমজানেও ফিলিস্তিনের জনসাধারণের মাঝে চরম খাদ্য সংকটে হাহাকার দেখা দিয়েছিলো। ফিলিস্তিনের এ বিপর্যস্ত সময়ে আমরা মুসলমানরা তাদের পাশে খাদ্য সামগ্রী সহায়তা নিয়ে দাড়ানো উচিত। মানুষের সংকটে এ মুহূর্তে গোপনে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা যেতে পারে। আল্লাহ গোপনে দানকে বেশি পছন্দ করেন। অসহায় দুস্ত মানুষের মুখে আহার তুলে দেওয়ার মত সোওয়াব আর অন্য কিছুতে হতে পারে না। এর মাঝে চরম আনন্দও রয়েছে। আমাদের একটু দান অন্যের মুখে হাসি ফুটাতে পারে। এই দান যেন মানুষের মানবিক মূল্যবোধে আঘাত না হানে। সে দিকে নজর রাখতে হবে। এই দানকৃত খাবার খেয়ে কোন মানুষ রোজা রাখালে তা প্রভুর কাছে অল্পতেই গৃহীত হবে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো তবে তা কতই না উত্তম, আর যদি গোপনে করো এবং অভাবীকে দাও, তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম’ (সুরা বাকারা: ২৭১) প্রিয় নবী (দঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে সে রোজাদারের সম পরিমাণ সওয়াব পাবে; রোজাদারের সওয়াব থেকে একটুও কমানো হবে না। (সুনানে তিরমিযি) বড় পির আবদুল কাদের জিলানী বলেন, মানুষকে খাওয়ানো মাঝে যে পরিমান সওয়াব ও মর্তবা রয়েছে যদি এই পৃথিবী পরিমাণ সম্পদ আমার থাকতো আমি মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতাম। আসলেই রমজান মাসের রোজা বান্দার জন্য মহান আল্লাহর একান্ত মহা অনুগ্রহ। তা একবাক্যে স্বীকার করতে হবে। অন্য সব রোজা থেকে আল্লাহর ফরজ করা নির্ধারিত রোজা সিয়াম সাধনার মাসের মর্যাদা ও মর্তবা অনেক অনেক বেশি। পবিত্র রমজান মাস মহান আল্লাহর সঙ্গে প্রিয় বান্দার প্রেম বিনিময়ের সবচেয়ে উত্তম ও উল্লেখযোগ্য মাস। এ মাসের ফজিলত ও মর্যাদা রয়েছে বহুগুণ। এটা ধৈর্য্যে, ত্যাগ, তিতিক্ষা, পরিক্ষা, সহানুভূতি প্রদর্শন ও মহান প্রভুকে রাজি খুশি করানোর মাস। বৃহত্তর নোয়াখালীতে ওলি আউলিয়াদের মাজার, খানকাহ, আস্তানাতে সংলগ্ন মসজিদে রমজান মাস ব্যাপী ইফতার মাহফিল ও সারা রাত ব্যাপী ইবাদত বন্দেগি জারি রয়েছে। যা এক ব্যাতিক্রমী উদ্যেগ। লেখকঃ সম্পাদক- আল সূফী বার্তা, শিবপুর দরবার শরীফ, মাইজদী কোর্ট, নোয়াখালী।