বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ হন হাফেজ মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সাদিক। তার স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে মাওলানা হওয়া, মায়ের দুঃখ মোচন করা এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি মফস্বল থেকে রাজধানীতে আসেন পড়াশোনা করতে। তবে তার স্বপ্ন পূরণের আগেই মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি শহীদ হন। স্বৈরাচারী সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লালসায় পুলিশের গুলিতে তিনি প্রাণ হারান।
জন্ম ও শিক্ষা জীবন:
হাফেজ সাদিকের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার পাহাড়ি পল্লি ফুলবাড়িয়ার করিমগঞ্জ ঘোনাপাড়া গ্রামে। তার বাবা কুয়েতপ্রবাসী লুৎফর রহমান লেবু এবং মা শাহনাজ বেগম। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় ভাই শামীম সিঙ্গাপুরপ্রবাসী এবং ছোট ভাই শাহেদ ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
শিক্ষাজীবনের শুরু করিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর বাবা-মায়ের ইচ্ছায় তিনি গ্রামের পার্শ্ববর্তী সখিপুরের আড়াইপাড়া মাদরাসায় হাফেজি পড়ার জন্য ভর্তি হন। সেখান থেকে ঢাকার মিরপুরের এক মাদরাসায় হাফেজি সম্পন্ন করেন এবং পরে ঢাকার আব্দুল্লাহপুরের জামিয়া দ্বীনিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় হাদিস বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
শহীদ হওয়ার দিন
গত বছরের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে, জুমার নামাজ শেষে সাদিক সহপাঠীদের সঙ্গে রাজপথে বিক্ষোভে যোগ দেন। পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করলে গুলি তার পিঠ ভেদ করে নাভির পাশে আটকে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন ২০ জুলাই জানা যায়, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি গুলিবিদ্ধ লাশের আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ না পেয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
পরিবারের হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি;
পরবর্তীতে মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট এসে তার লাশ শনাক্ত করেন। তার চাচারা সাদিকের লাশ নিয়ে যান ঘাটাইলের ফুলবাড়িয়া করিমগঞ্জ গ্রামে এবং সেখানে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সাদিকের মা শাহনাজ বেগম বলেন, ‘সাদিক বড় হয়ে মাওলানা হয়ে আমার দুঃখ মোচন করতে চেয়েছিল। সে বলেছিল, তখন আর আমাকে পরিশ্রম করতে হবে না। বাড়িতে টিনের ঘরের পরিবর্তে পাঁচতলা ভবন বানিয়ে দেবে।’
সহায়তা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ:
শহীদ পরিবার হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে কিছু সংগঠন। ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ পাঁচ লাখ টাকা এবং ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। তবে পরিবারটি এখনো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
শহীদ হাফেজ সাদিকের আত্মত্যাগ ও স্বপ্ন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে নয়, গোটা সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যে, আমরা কেমন রাষ্ট্রে বাস করছি যেখানে একটি সম্ভাবনাময় জীবন এভাবে থেমে যেতে পারে?