মাসুদ চৌধুরী সাঈদ : পদ্মা-যমুনা ও বালু মহাল যেনো স্বর্ণকুপ। প্রবেশ করলেই কোটিপতি। স্বৈরাচার আওয়ামী জাহেলী লীগ আমলে শুরু হয় অবৈধ বালু-মাটি রমরমা ব্যবসা। সরকারি কোষাগারে না দিয়ে একেকটি অংশ যেত বিভিন্ন মহলে। যে কারণে চোখ বুজে তান্ডব চালিয়েছে বালু দস্যুরা। যা মাস্টার মাইন্ডে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহীউদ্দীন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম- সম্পাদক সুলতানুল আজম খান আপেলসহ কয়েকজন গডফাদার। এরা মানিকগঞ্জে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। গ্রাস করছে পুরো জেলাকে। আর এদের সিপাহসালার জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক আবুল বাশার। যার নেতৃত্বে জেলাজুড়ে রয়েছে বালু-মাটি খেকো সন্ত্রাসী বাহিনী। শুধু পদ্ম-যমুনা নয়, খেয়েছে তিন ফসলি জমি, নদী-নালা, খাল-বিল ও ডোবার মাটি। এই অবৈধ বালু-মাটি ব্যবসায়ী আবুল বাশার ছিলো একজন ডিস শ্রমিক। সেখান থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে নজরে পড়ে গডফাদারদের। হয়ে উঠেন বালু মহালের সম্রাট। তারপর থেকেই আর পিছনে তাকাতেই হয়নি তার। তারই ধারাবাহিকতায় অবৈধ বালু মহালের সমরাজ্য কায়েম করতে সহযোগি আরিচার বালু সম্রাট কিবরিয়া ও দৌলতপুর উপজেলা কৃষক লীগের আহ্বায়ক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নাঈম। জানা যায় ঐসময় বালু মহালের ইজারা ছিলো মানিকগঞ্জ জেলায় হরিরামপুর, ঘিওর ও শিবালয়। ইজারা বহির্ভুত স্থান দৌলতপুর উপজেলার কাশিদয়ারামপুর চরে ৫/৬ টা কাটার মেশিন (ড্রেজার) দিয়ে যমুনার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করতো। আর বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীরবর্তী এলাকা বসত বাড়ি-ঘর ও জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় হতাশায় ভেঙে পড়ে ঐ অঞ্চলের মানুষ। গত ২০২৪ সালে জুন মাসে গণমাধ্যম কর্মী মাসুদ চৌধুরী সাঈদ নদী ভাঙ্গনের প্রতিবেদন করতে গেলে কাটার মেশিন ও বাল্কহেডে থাকা আইয়ুবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। সে হামলায় ডান হাত ভেঙে যায়। পরে দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন তোতা ও কিবরিয়ার নেতৃত্বে বাবু শেখ, জামাল উদ্দিন ও মুক্তার হোসেনসহ সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ট্রলারযোগে সিরাজগঞ্জে প্রায় কাছাকাছি যমুনা নদীর মাঝখানে নোঙর করে ঐ গণমাধ্যম কর্মীকে অমানুষিক নির্যাতন এবং জবাই করে হত্যা প্রস্তুতি নেয়া। কিন্তু সাথে থাকা সহকর্মী পালিয়ে যাওয়ার কারণে আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে উঠে। পরে ঐ সন্ত্রাসী বাহিনী গণমাধ্যম কর্মীকে দৌলতপুর থানায় রেখে পালিয়ে যায়। স্বৈরাচার সরকার আওয়ামী লীগের আমলে পদ্মা- যমুনা কথিত ইজারা পায়, হরিরামপুরে- মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ও হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমান, ঘিওরে- মানিকগঞ্জ- ১ আসনের সাংসদ সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ (এস এম জাহিদ) এমপি, মানিকগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাহিদুল ইসলাম পরে ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তুষার ও শিবালয়ে- জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক আবুল বাশার। তারই ধারাবাহিকতায় সেই ইজারায় এখনো অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। যমুনায় বাবু শেখ, জামাল উদ্দিন ও মুক্তার হোসেনসহ বালু চোর অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে পদ্মায় দাস কান্দি এলাকায় ( পাটুরিয়া ঘাট বালু মহাল) খ্যাত জসিম পদ্মায় কাটার মেশিন দিয়ে দেধারছে বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি চলে যান কোটি কোটি বনে। তাদের অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন চলমান। বহুমাত্রিক এবং বৈশিষ্ট্য মন্ডিত অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রশাসন একটু হলেও ঘুরে বসেছে। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা হলেও থেমে নেই বালু দস্যুরা। সমাজের বিশিষ্টজনেরা জানান, অভিযান পরিচালনা হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু থেমে নেই পেশাদার বালু চোররা। এ অভিযানে যদি অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন করা যন্ত্রনাংশ বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করে দেয়া হয়, হয়তো বন্ধ হতে পারে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন। তাহলেই কমতে পারে নদী ভাঙ্গন। অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙনের শঙ্কায় রয়েছে তীরবর্তী ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এলাকাবাসী বলছেন, প্রশাসনের একাধিক অভিযানের পরেও বালু দস্যুরা থেমে নেই, বরং দ্বিগুণ উৎসাহে বালু উত্তোলন করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উপজেলা প্রশাসন বেশ কয়েকবার অভিযান চালায়। সর্বশেষ ১৭ জানুয়ারি অভিযানে ১২ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ছয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর কিছুদিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও ফের চলছে বালু- মাটি লুট। গত ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার শিবালয় প্রশাসন আরেক দফা অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। সব মিলিয়ে জানুয়ারিতে ১৮ জনকে আটক করা হয় এবং ১২ জনকে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, নদী থেকে বালু তোলার কারণে প্রতি বছর বর্ষার সময় আমাদের অনেক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এবছরও যদি বালু উত্তোলন বন্ধ না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বালুদস্যুদের রুখতে হবে এবং অবৈধ বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। নইলে নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ বেলাল হোসেন জানান, অবৈধভাবে কেউ নদী থেকে বালু তুলতে পারবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।